কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: উৎপাদনশীলতা বনাম নীরব দুর্ভোগের হিসাব | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: উৎপাদনশীলতা বনাম নীরব দুর্ভোগের হিসাব

নাসরিন আক্তার  avatar   
নাসরিন আক্তার
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: উৎপাদনশীলতা বনাম নীরব দুর্ভোগের হিসাব
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: উৎপাদনশীলতা বনাম নীরব দুর্ভোগের হিসাব
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ১৫-২০% মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যার একটি ...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ১৫-২০% মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্রের চাপ-সৃষ্ট। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং কর্মজীবীদের নীরব দুর্ভোগের এক করুণ চিত্র। কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, যা পূর্বে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হতো, এখন ক্রমশ জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে, মহামারী-পরবর্তী সময়ে কাজের ধরন, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং কাজের অতিরিক্ত বোঝা এই চাপকে আরও তীব্র করেছে, যা কর্মীদের উৎপাদনশীলতা এবং সামগ্রিক সুস্থতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। অনেক ক্ষেত্রেই এই মানসিক চাপ কর্মীর ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এমনকি শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এখনো অপ্রতুল। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও হাসপাতাল কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা কর্মীদের মধ্যে মাত্র ১০-১৫% পেশাদার সহায়তা গ্রহণ করেন। বাকিরা সামাজিক কুসংস্কার, কর্ম হারানোর ভয় অথবা সহায়তা ব্যবস্থার অভাবের কারণে নীরব থাকেন। এই নীরবতা শুধু ব্যক্তির ক্ষতি করে না, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্ষমতাও হ্রাস করে। উদাহরণস্বরূপ, অতিরিক্ত চাপ, হয়রানি বা কর্মপরিবেশের প্রতিকূলতার কারণে কর্মীদের মধ্যে প্রায়শই বার্নআউট (burnout) দেখা যায়, যা অনুপস্থিতি বৃদ্ধি, কাজের মান হ্রাস এবং কর্মপরিবেশে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) বিভিন্ন সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ নিলেও, কর্মক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন ও ফলো-আপের ক্ষেত্রে এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে।

এই সমস্যা কেবল বড় কর্পোরেট বা নির্দিষ্ট খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সরকারি-বেসরকারি সকল স্তরের কর্মজীবীরাই এর শিকার। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এর তথ্য অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জটিলতা যেমন উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং স্ট্রেস-সম্পর্কিত অসুস্থতা এখন অসংক্রামক ব্যাধিগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, যা কর্মজীবীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা ও অক্ষমতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই সমস্যা নিরসনে একটি সমন্বিত ও বহু-মাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য, যেখানে কর্মপরিবেশের উন্নতি, মানসিক স্বাস্থ্য সেবার সহজলভ্যতা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি – এই তিনটি স্তম্ভ সমানভাবে গুরুত্ব পাবে। অন্যথায়, কর্মক্ষেত্রের এই নীরব দুর্ভোগ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতেই থাকবে।

সূচক ২০১৮ ২০২৩ পরিবর্তন (%)
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ জনিত অসুস্থতার হার (প্রতি ১০০ জনে) ১২.৫ ১৫.৮ +২৬.৪
মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা (লক্ষ) ৩.২ ৪.১ +২৮.১
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা আছে এমন প্রতিষ্ঠানের শতাংশ ৮.৭ ১১.২ +২৮.৭
DGHS-এর হেল্পলাইন ব্যবহারকারীর সংখ্যা (হাজার) ২২.১ ৩২.৫ +৪৭.১

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সমীক্ষা।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলপত্র' (National Mental Health Strategy) এর আলোকে প্রতিটি কর্মপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং DGHS এর মাধ্যমে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর তত্ত্বাবধানে কর্মক্ষেত্রে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট, সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যেখানে IEDCR এর গবেষণাভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করে কার্যকর পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে।
  • DGDA (ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর) এর তত্ত্বাবধানে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা সহজলভ্য করতে কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পর্যায়ে প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় ঔষধপত্রের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কর্মজীবীরা সহজেই সহায়তা পেতে পারেন।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন আক্তার

নাসরিন আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator