বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর: ভার্চুয়াল কোর্টের কার্যকারিতা ও… | আই নিউজ বিডি

বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর: ভার্চুয়াল কোর্টের কার্যকারিতা ও প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ

ব্যারিস্টার রাজীব  avatar   
ব্যারিস্টার রাজীব
বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর: ভার্চুয়াল কোর্টের কার্যকারিতা ও প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ
বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর: ভার্চুয়াল কোর্টের কার্যকারিতা ও প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
২০২০ সালের ৯ মে 'আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০' জারি এবং পরবর্তীতে 'আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০' প্রণয়নের মাধ্যমে বাং...

২০২০ সালের ৯ মে 'আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০' জারি এবং পরবর্তীতে 'আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০' প্রণয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় ভার্চুয়াল আদালতের পথচলা শুরু হয়। এই আইন প্রণয়নের পর থেকে গত চার বছরে বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিশেষ করে, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় যখন স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখন এই অধ্যাদেশ ও আইন বিচারিক কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ভার্চুয়াল কোর্ট চালুর পর প্রথম তিন বছরে প্রায় ৪.৫ লক্ষ ফৌজদারি মামলায় জামিন নিষ্পত্তি হয়েছে, যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য একটি বিশাল স্বস্তি এনে দিয়েছে।

এই ডিজিটাল উত্তরণ কেবল মহামারীর সংকটকালীন সমাধান ছিল না, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের সূচনা। ভার্চুয়াল কোর্ট সিস্টেম বিচার ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, মামলার জট কমানো এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুততর করার সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে। তবে, এই কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে গিয়ে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বাংলাদেশের জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং উচ্চ আদালতের বিচারকদের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ-গতির ইন্টারনেট সংযোগ, আধুনিক হার্ডওয়্যার এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এখনও অনেক ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সরকার এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত 'ই-জুডিশিয়ারি' প্রকল্পের অধীনে দেশের সকল আদালতকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার প্রচেষ্টা চলছে, কিন্তু দূরবর্তী অঞ্চলের আদালতগুলোতে প্রায়শই ব্যান্ডউইথ স্বল্পতা এবং কারিগরি সহায়তার অভাব দৃশ্যমান। এমনকি, অ্যাডভোকেটদের ডিজিটাল স্বাক্ষর এবং ইলেকট্রনিক ফাইলিং সিস্টেমের ব্যবহার এখনও সর্বজনীন হয়নি, যা ভার্চুয়াল শুনানির পূর্ণ সক্ষমতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল করার জন্য কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, বরং বিচারক, আইনজীবী, আদালত কর্মচারী এবং বিচারপ্রার্থী সকলের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধিও অপরিহার্য। অনেক ক্ষেত্রে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ইন্টারনেট সুবিধা ও ডিজিটাল ডিভাইসের অভাবে ভার্চুয়াল কোর্টে অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে, যা ন্যায়বিচারের সর্বজনীন প্রবেশাধিকারের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ভার্চুয়াল কোর্টের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের সাথে অংশীদারিত্বে কাজ করছে। ADB তাদের 'Strengthening Governance and Public Financial Management Program' এর আওতায় বিচার বিভাগের ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব করেছে। এই প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য হলো, বিচারিক প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করা, ই-ফাইলিং সিস্টেমের পরিধি বাড়ানো এবং একটি সমন্বিত কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS) বাস্তবায়ন করা। CMS বাস্তবায়ন হলে মামলার তথ্য ব্যবস্থাপনা, শুনানির সময়সূচী নির্ধারণ এবং রায় ও আদেশের দ্রুত বিতরণ সহজ হবে। বর্তমানে, বিচারিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত বিভিন্ন সফটওয়্যার ও প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব একটি বড় সমস্যা। ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তথ্য সংরক্ষণ এবং আদান-প্রদানে জটিলতা সৃষ্টি হয়, যা বিচারিক প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, কিছু আদালতে অনলাইন জামিন আবেদন গ্রহণ করা হলেও, সাক্ষ্যগ্রহণ বা জেরা এখনও শারীরিকভাবে আদালতের উপস্থিতিতেই সম্পন্ন হয়, যা ভার্চুয়াল কোর্টের পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতাকে সীমিত করে। এই সমন্বয়হীনতা দূর করতে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য, যেখানে মামলার শুরু থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত সকল প্রক্রিয়া একই ছাতার নিচে পরিচালিত হবে। এছাড়াও, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি ভার্চুয়াল কোর্ট ব্যবস্থার জন্য একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ। মামলার সংবেদনশীল তথ্য এবং ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষার জন্য শক্তিশালী এনক্রিপশন এবং সাইবার নিরাপত্তা প্রোটোকল নিশ্চিত করা জরুরি।

ভার্চুয়াল কোর্টের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ (২০২০-২০২৩) সংখ্যা/শতাংশ মন্তব্য
মোট জামিন নিষ্পত্তি (আনুমানিক) ৪,৫০,০০০+ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য।
আদালতে ইন্টারনেট সংযোগের দুর্বলতা (জেলা পর্যায়ে) ৬৫% ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর 'ই-জুডিশিয়ারি' প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষা অনুযায়ী।
ই-ফাইলিং সিস্টেমের ব্যবহারকারী (আইনজীবী) ২২% বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যৌথ জরিপ (২০২৩)।
ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচীর আওতায় আসা বিচারক/কর্মকর্তা ৩৫% বাংলাদেশ সরকার ও ADB-এর যৌথ উদ্যোগের তথ্য।
সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা (রিপোর্টকৃত) ০.৮% প্রধান বিচারপতির কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত সীমিত তথ্য।

উৎস: আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, প্রধান বিচারপতির কার্যালয়, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প), ADB (Strengthening Governance Program), বাংলাদেশ বার কাউন্সিল।

সুপারিশ

  • আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে 'আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০' এর অধীনে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা (Roadmap) প্রণয়ন করতে হবে, যা ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের সকল আদালতকে একটি অভিন্ন, এন্ড-টু-এন্ড ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় আনবে। এই পরিকল্পনায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং ADB-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তাকে সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে বিচারক, আইনজীবী ও আদালত কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচী চালু করতে হবে। এই কর্মসূচী অবশ্যই 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮' এর অধীনে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা এবং 'ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর আইন, ২০০০' এর ব্যবহারিক প্রয়োগের উপর বিশেষ জোর দেবে।
  • বিচার বিভাগের জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। এই ইউনিটকে 'জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কৌশল, ২০২১' এর আলোকে বিচারিক তথ্য সুরক্ষায় নিয়মিত নিরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আধুনিক এনক্রিপশন প্রযুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিতে হবে, যাতে সংবেদনশীল বিচারিক ডেটার গোপনীয়তা ও অখণ্ডতা নিশ্চিত হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার রাজীব

ব্যারিস্টার রাজীব 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator