জলবায়ু অভিবাসন: বৈশ্বিক শরণার্থী সংকটের নতুন মুখ ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জলবায়ু অভিবাসন: বৈশ্বিক শরণার্থী সংকটের নতুন মুখ ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি

রাসেল মাহমুদ  avatar   
রাসেল মাহমুদ
জলবায়ু অভিবাসন: বৈশ্বিক শরণার্থী সংকটের নতুন মুখ ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি
জলবায়ু অভিবাসন: বৈশ্বিক শরণার্থী সংকটের নতুন মুখ ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ কোটি ১৬ ল...

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ কোটি ১৬ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশগুলোর মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এই পরিসংখ্যান কেবল হিমশৈলের চূড়া মাত্র, কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও খরা ক্রমশ লক্ষ লক্ষ মানুষকে তাদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য করছে, যা একটি নতুন বৈশ্বিক শরণার্থী সংকট — জলবায়ু অভিবাসন — সৃষ্টি করছে। এই সংকট কেবল মানবিক নয়, এটি ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও এক বড় চ্যালেঞ্জ।

এই জলবায়ু অভিবাসন শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রত্যক্ষ ফল নয়, বরং এটি দারিদ্র্য, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং সীমিত সম্পদের উপর চাপ সৃষ্টি করে বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও প্রকট করে তুলছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ৭ লক্ষ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং খুলনার মতো মহানগরীগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন। এই অভ্যন্তরীণ অভিবাসন শহরগুলোর অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থান খাতে তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে, যা নতুন করে সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে, এই অভিবাসনের বিষয়টি এখনও প্রথাগত শরণার্থী সংজ্ঞার আওতায় আসেনি, কারণ ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন মূলত রাজনৈতিক নিপীড়ন বা যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফলে, জলবায়ু অভিবাসীরা প্রায়শই আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন, যা তাদের আরও দুর্বল করে তোলে এবং মানব পাচার ও শোষণ চক্রের শিকার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। এই পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি নতুন আইনি কাঠামো এবং সহায়তার প্রক্রিয়া তৈরির প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, যেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়মিত বৈশ্বিক ফোরামে সরব ভূমিকা পালন করছে।

দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু অভিবাসন একটি জটিল মাত্রা যোগ করেছে। ভারত, মিয়ানমার, নেপাল এবং ভুটানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে জলবায়ু অভিবাসন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এবং সার্ক (South Asian Association for Regional Cooperation)-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোতে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও, কার্যকর সমন্বিত নীতি বা বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা এখনও অনুপস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, সার্কের আওতায় জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হলেও, জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য আন্তঃদেশীয় সুরক্ষা বা পুনর্বাসন নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো চুক্তি বা প্রোটোকল এখনো স্বাক্ষর হয়নি। এর ফলে, জলবায়ু অভিবাসীরা প্রায়শই সীমান্ত অতিক্রম করে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচিত হন, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও টানাপোড়েন সৃষ্টি করে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, বাংলাদেশ UN Peacekeeping মিশনে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি সমন্বিত কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে পারে, যেখানে মানবিক সহায়তা এবং নিরাপত্তা উভয়কেই গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বিষয় ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ উৎস
জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি (লাখ) ২৫ ৩০ ৩২ ৩৪ অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (IDMC)
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থায় (UNHCR) তালিকাভুক্ত জলবায়ু-প্রভাবিত বাস্তুচ্যুতদের জন্য বৈশ্বিক সহায়তা বাজেট (বিলিয়ন USD) ০.২ ০.৩ ০.৪ ০.৫ জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR)
বাংলাদেশের জিডিপির শতাংশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির পূর্বাভাস (ক্ষতি কমানো না গেলে) ১.৫% ১.৮% ২.০% ২.৫% বিশ্বব্যাংক

উৎস: অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (IDMC), জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR), বিশ্বব্যাংক

সুপারিশ

  • জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো প্রণয়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-কে নেতৃত্বে থাকতে হবে এবং জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশন (১৯৫১) ও এর প্রোটোকল (১৯৬৭)-এর পরিধি সম্প্রসারণের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে, অথবা একটি স্বতন্ত্র 'জলবায়ু অভিবাসী কনভেনশন' প্রণয়নের প্রস্তাবনা উত্থাপন করতে হবে।
  • BIMSTEC ও সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক জলবায়ু অভিবাসন নীতি (Regional Climate Migration Policy) এবং তহবিল (Regional Climate Resilience Fund) গঠনের জন্য বাংলাদেশ-কে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, তথ্য আদান-প্রদান এবং জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য মানবিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের মানদণ্ড নির্ধারণ করবে।
  • অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য একটি জাতীয় নীতি (National Climate Migration Policy) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়-এর নেতৃত্বে অবকাঠামো উন্নয়ন, জীবিকা নির্বাহের বিকল্প ব্যবস্থা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রাসেল মাহমুদ

রাসেল মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বৈশ্বিক অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator