চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: অটোমেশনের যুগে নতুন দক্ষতার… | আই নিউজ বিডি

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: অটোমেশনের যুগে নতুন দক্ষতার সন্ধানে বাংলাদেশ

আরিফুর রহমান  avatar   
আরিফুর রহমান
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: অটোমেশনের যুগে নতুন দক্ষতার সন্ধানে বাংলাদেশ
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: অটোমেশনের যুগে নতুন দক্ষতার সন্ধানে বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) একটি প্রতিবেদনে ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ৮০ মিলিয়ন কর্মসংস্থান স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার হাতে চলে যাওয়ার পূর্বাভা...

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) একটি প্রতিবেদনে ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ৮০ মিলিয়ন কর্মসংস্থান স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার হাতে চলে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরও পড়তে পারে। বিশেষত, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প যেখানে প্রায় ৪ মিলিয়ন মানুষ কর্মরত, সেখানে অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) প্রয়োগ উৎপাদনশীলতা বাড়ালেও প্রথাগত কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশে নতুন দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষার বিষয়টি এখন আর কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি জাতীয় নীতি নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই ঢেউ বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে কীভাবে পুনর্গঠিত করছে এবং এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু, তা এখন গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব কেবল প্রযুক্তির অগ্রগতি নয়, এটি উৎপাদন, পরিষেবা এবং শ্রমবাজারের মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে রোবটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ফিনিশিং ও প্যাকেজিংয়ের মতো পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন হওয়ায় শ্রমিকদের একাংশ কর্মহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। একইভাবে, কৃষি ও পরিষেবা খাতেও ড্রোন প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং এআই-চালিত সেবা গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো প্রচলিত কর্মপদ্ধতিকে বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৪০% এখনও কৃষি খাতে নিয়োজিত, যেখানে প্রযুক্তির প্রয়োগ উৎপাদন বাড়ালেও শ্রমঘনতা কমিয়ে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে একটি বড় অংশের শ্রমশক্তিকে বেকারত্বের মুখোমুখি হতে হবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে ফাইভজি প্রযুক্তি, ব্লকচেইন, সাইবারসিকিউরিটি, ডেটা সায়েন্স, এআই/মেশিন লার্নিং এবং ক্লাউড কম্পিউটিং-এর মতো ক্ষেত্রগুলো সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে, কিন্তু এই দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বর্তমান শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা মেটাতে কতটা প্রস্তুত, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কারিকুলাম আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নিলেও, এর বাস্তবায়ন ধীরগতিতে চলছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও সনাতন পদ্ধতির শিক্ষাদান প্রচলিত, যা শিক্ষার্থীদের আধুনিক শ্রমবাজারের জন্য প্রস্তুত করতে পারছে না। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেমন SEIP (Skills for Employment Investment Program), যা শিল্পভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তবে, প্রশিক্ষকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করার অভাব, প্রয়োজনীয় ল্যাব সুবিধা এবং শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগের দুর্বলতা এই উদ্যোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ সফলতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্যমতে, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও, গুণগত মান এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশিক্ষণের অভাব রয়ে গেছে। ফলে, স্নাতকরা প্রায়শই শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারছেন না, যা দেশের সার্বিক কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

খাত/সূচক ২০১৬ সাল ২০২১ সাল প্রবণতা/প্রভাব
কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হার (মাধ্যমিক স্তরে) ১৪% ১৭.২% ধীরগতিতে বৃদ্ধি, সরকারের লক্ষ্য ৩০%
তৈরি পোশাক শিল্পে অটোমেশনের কারণে সম্ভাব্য কর্মচ্যুতি অপ্রযোজ্য ১২% (আনুমানিক) নিম্ন-দক্ষ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের ঝুঁকি বৃদ্ধি
ডিজিটাল দক্ষতা প্রয়োজন এমন চাকরির সংখ্যা (শতাংশ) ৩০% (আনুমানিক) ৫০% (আনুমানিক) উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, তবে প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব
SEIP এর আওতায় প্রশিক্ষিত জনবল ২০,০০০ (আনুমানিক) ১,৫০,০০০ (আনুমানিক) উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, তবে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল

উৎস: BANBEIS, ILO, SEIP প্রকল্প প্রতিবেদন, BBS (বিভিন্ন সময়ের তথ্য সমন্বয় করে আনুমানিক চিত্র)

সুপারিশ

  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কে আরও শক্তিশালী করে একটি সমন্বিত জাতীয় দক্ষতা ফ্রেমওয়ার্ক (NSQF) দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক দক্ষতা চিহ্নিত করে কারিকুলাম তৈরি করা হবে এবং বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর মানদণ্ডের আওতায় এনে নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কে দেশের সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী যুগোপযোগী করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে, বিশেষত ডেটা সায়েন্স, এআই/মেশিন লার্নিং, রোবটিক্স এবং সাইবারসিকিউরিটির মতো বিষয়গুলোতে নতুন বিভাগ ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং SEIP (Skills for Employment Investment Program) কে শিল্প খাতের সঙ্গে নিবিড় অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি 'ভবিষ্যত দক্ষতা তহবিল' (Future Skills Fund) গঠন করতে হবে, যা নতুন প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করবে এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কর্মীদের আপস্কিলিং ও রিস্কিলিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য কর ছাড় বা প্রণোদনা প্রদান করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আরিফুর রহমান

আরিফুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator