বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর: ই-ফাইলিংয়ের অগ্রগতি ও বিচারপ্রার্থী… | আই নিউজ বিডি

বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর: ই-ফাইলিংয়ের অগ্রগতি ও বিচারপ্রার্থী দুর্ভোগ নিরসনের চ্যালেঞ্জ

ব্যারিস্টার রাজীব  avatar   
ব্যারিস্টার রাজীব
বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর: ই-ফাইলিংয়ের অগ্রগতি ও বিচারপ্রার্থী দুর্ভোগ নিরসনের চ্যালেঞ্জ
বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর: ই-ফাইলিংয়ের অগ্রগতি ও বিচারপ্রার্থী দুর্ভোগ নিরসনের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, দেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে ই-ফাইলিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের ডিজিটাল রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষাকে নতুন...

সম্প্রতি, দেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে ই-ফাইলিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের ডিজিটাল রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। গত মাসেই প্রধান বিচারপতি মহোদয় এই ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে উল্লেখ করেন যে, এটি বিচার ব্যবস্থাকে আরও জনমুখী ও গতিশীল করতে সহায়ক হবে। বিচারপ্রার্থীরা এখন ঘরে বসেই মামলার তথ্য ও অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারবেন, যা ঐতিহ্যবাহী বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও জটিলতাকে কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে, এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি বিচারপ্রার্থী জনগণের দুর্ভোগ নিরসনের চ্যালেঞ্জগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি।

বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে ই-ফাইলিং প্রবর্তন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের বিচারিক সংস্কার কর্মসূচিতে দীর্ঘকাল ধরে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয়িত হচ্ছে। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো মামলার আবেদন, জবাব, নথি জমা দেওয়া এবং শুনানির তারিখ নির্ধারণসহ বিচারিক কার্যক্রমকে অনলাইনে সম্পন্ন করে সময় ও খরচ সাশ্রয় করা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অর্থাৎ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এর ফলে, বিচারকদের কর্মপরিবেশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে এবং মামলার জট কমানোর ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু আদালতে ই-ফাইলিং সফলভাবে চালু হলেও, এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো অনেক দূর।

তবে, এই ডিজিটাল অগ্রগতির পথ মসৃণ নয়। ই-ফাইলিং ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে। অনেক বিচারপ্রার্থী এখনও কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহারে অভ্যস্ত নন, ফলে তাদের জন্য এই নতুন ব্যবস্থা বরং নতুন এক দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আইনজীবীদের মধ্যেও ই-ফাইলিংয়ের ব্যবহার নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে; কেউ কেউ দ্রুত এটি গ্রহণ করলেও, অনেকে পুরাতন পদ্ধতিতে অভ্যস্ত থাকায় নতুন প্রযুক্তির প্রতি অনীহা দেখাচ্ছেন। এছাড়া, ইন্টারনেট সংযোগের দুর্বলতা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট ও দক্ষ জনবলের অভাবও এই ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতায় বাধা সৃষ্টি করছে। এমনকি, সিস্টেমের নিরাপত্তা ও ডেটা সুরক্ষার বিষয়টিও একটি বড় উদ্বেগের কারণ, কারণ বিচারিক তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।

এই চ্যালেঞ্জগুলো সরাসরি বিচারপ্রার্থী জনগণের দুর্ভোগকে প্রভাবিত করছে। ই-ফাইলিংয়ের সুবিধা সকলের কাছে পৌঁছাতে না পারলে, এটি একশ্রেণির মানুষের জন্য বিচারপ্রাপ্তি সহজ করলেও, আরেক শ্রেণির মানুষের জন্য বিচার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ আরও কঠিন করে তুলবে। উদাহরণস্বরূপ, একজন দরিদ্র কৃষককে তার মামলার ই-ফাইলিংয়ের জন্য হয়তো শহরের সাইবার ক্যাফেতে যেতে হচ্ছে এবং অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে, যা তার জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক বোঝা। অন্যদিকে, বিচারিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে অনেক সময় ই-ফাইলিং করা নথি যাচাই-বাছাই ও প্রক্রিয়াকরণে বিলম্ব হচ্ছে, যা মামলার নিষ্পত্তিকে আরও ধীর করে দিচ্ছে। ফলে, প্রযুক্তিগত সমাধান থাকা সত্ত্বেও, কাঙ্ক্ষিত দ্রুত ও সহজ বিচার প্রাপ্তি অনেক বিচারপ্রার্থীর কাছে এখনও অধরা রয়ে গেছে। বাংলাদেশ সরকার এই সমস্যা নিরসনে সচেষ্ট হলেও, একটি সমন্বিত ও বহু-স্তরীয় কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য।

সূচক ২০২২ ২০২৩ লক্ষ্য ২০২৪
ই-ফাইলিং সক্ষম আদালতের সংখ্যা ৩৫০টি ৬৫০টি ১০০০টি
ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমে দাখিলকৃত মামলার শতাংশ ১৫% ৩২% ৬০%
ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আইনজীবী ৮,০০০ ১৮,০০০ ৪০,০০০
বিচার বিভাগে ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিনিয়োগ (কোটি টাকা) ১৫০ ২৫০ ৪০০

উৎস: আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন

সুপারিশ

  • বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর প্রকল্প (যেমন, 'জুডিশিয়াল ডিজিটালাইজেশন প্রজেক্ট') এর অধীনে 'জাতীয় ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রোগ্রাম' চালু করা হোক, যা বাংলাদেশ সরকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশন ২০৪১' এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রান্তিক বিচারপ্রার্থী এবং আইনজীবীদের জন্য বিনামূল্যে ই-ফাইলিং ও ডিজিটাল লিটারেসি বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান নিশ্চিত করা।
  • ই-জুডিশিয়ারি ব্যবস্থার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'ডেটা সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা' প্রণয়ন করা এবং 'তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬' (সংশোধিত) এর অধীনে বিচারিক তথ্যের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অডিট ও আপগ্রেডেশন পরিচালনা করা।
  • 'জেলা লিগ্যাল এইড কমিটি' এর মাধ্যমে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ই-ফাইলিং হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে 'আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০' এর আওতাধীন বাজেট বৃদ্ধি করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার রাজীব

ব্যারিস্টার রাজীব 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator