শেয়ারবাজারের ফাঁদ: করপোরেট সুশাসনের নামে লুটেরাদের কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শেয়ারবাজারের ফাঁদ: করপোরেট সুশাসনের নামে লুটেরাদের কৌশল

অ্যাডভোকেট কায়সার  avatar   
অ্যাডভোকেট কায়সার
শেয়ারবাজারের ফাঁদ: করপোরেট সুশাসনের নামে লুটেরাদের কৌশল
শেয়ারবাজারের ফাঁদ: করপোরেট সুশাসনের নামে লুটেরাদের কৌশল
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের বার্ষিক নিরীক্ষায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত একটি বহুজাতিক ঔষধ প্রস্তুতকারক কোম্পানির করপোরেট সুশাসন পরিপালনের স্কোর আশঙ্...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের বার্ষিক নিরীক্ষায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত একটি বহুজাতিক ঔষধ প্রস্তুতকারক কোম্পানির করপোরেট সুশাসন পরিপালনের স্কোর আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে অস্বাভাবিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের (Related Party Transaction) মাধ্যমে তহবিল সরানোর প্রাথমিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই উদ্বেগ প্রকাশ পায়। যদিও কোম্পানিটি বাহ্যিকভাবে করপোরেট সুশাসনের সকল শর্ত পূরণ করার দাবি করে আসছিল, বিএসইসি'র প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ব্যবস্থাপনা পর্ষদের কতিপয় সদস্যের যোগসাজশে শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের অপচেষ্টা চলেছে। এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করে যে, শেয়ারবাজারে তথাকথিত 'করপোরেট সুশাসন' প্রায়শই লুটেরাদের জন্য একটি মুখোশ হিসেবে কাজ করে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি শুষে নেওয়ার এক নতুন কৌশল মাত্র।

এই মুখোশের আড়ালে থাকা কৌশলগুলো প্রায়শই সূক্ষ্ম এবং আইনগত ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যবস্থাপনা পর্ষদের স্বতন্ত্র পরিচালক (Independent Director) নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিএসইসি'র ২০১৯ সালের করপোরেট সুশাসন কোড অনুযায়ী, স্বতন্ত্র পরিচালকদের একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করে নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে অনেক কোম্পানিই নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে এই পদে বসিয়ে দেয়, যারা পর্ষদের অনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নীরব ভূমিকা পালন করেন। এই অকার্যকর স্বাধীন পর্ষদ, যা World Bank এর 'গভর্নেন্স ইন্ডিকেটরস'-এ দুর্বল প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোর একটি সূচক হিসেবে বিবেচিত, প্রায়শই ভুয়া বা অতিরঞ্জিত আর্থিক তথ্য অনুমোদন করে, যা বিনিয়োগকারীদের ভুল পথে চালিত করে। এর ফলে, কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটি (Audit Committee) এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি (Risk Management Committee) কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, এবং শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার সুরক্ষিত রাখার পরিবর্তে লুটেরা চক্রের সুবিধাভোগী হিসেবে কাজ করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'ক্যাপিটাল মার্কেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম'-এর আওতায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে যে সকল সংস্কারের কথা বলেছে, তার মধ্যে স্বাধীন পরিচালকদের ক্ষমতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি অন্যতম, যা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

শুধু স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগেই নয়, করপোরেট সুশাসনের নামে আরও একটি বড় কৌশল হলো জটিল আর্থিক কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে অস্বচ্ছ লেনদেন (Related Party Transactions) ব্যবহার করা। অনেক কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সাবসিডিয়ারি বা সহযোগী প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, যেগুলোর সাথে মূল কোম্পানির লেনদেনগুলো অত্যন্ত অস্বচ্ছ হয় এবং উচ্চমূল্যে পণ্য বা সেবা ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে মূল কোম্পানির তহবিল সরিয়ে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) বেশ কিছু ক্ষেত্রে এমন লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ পাচারের ইঙ্গিত পেয়েছে, যেখানে শেয়ারবাজার থেকে সংগৃহীত পুঁজিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে। এই ধরনের লেনদেনগুলো, যা সাধারণত 'অ্যাডভান্সড প্রাইসিং মেকানিজম' এবং 'ট্রান্সফার প্রাইসিং' এর মতো কৌশল ব্যবহার করে লুকানো হয়, সাধারণ নিরীক্ষকদের পক্ষেও সহজে সনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে, যতক্ষণ না একটি ফরেনসিক অডিট পরিচালিত হয়। ফলস্বরূপ, কোম্পানিটির প্রকৃত আর্থিক চিত্র বিনিয়োগকারীদের কাছে গোপন থাকে এবং কৃত্রিমভাবে উচ্চ মুনাফা দেখিয়ে শেয়ারের মূল্য বাড়ানো হয়। যখন এই ফাঁদ ফাঁস হয়, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের সর্বস্ব হারান।

বছর ডিএসই-তে করপোরেট সুশাসন কোড পরিপালনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা (শতকরা) বিএসইসি কর্তৃক তদন্তাধীন অস্বাভাবিক লেনদেন সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা World Bank এর 'গভর্নেন্স ইন্ডিকেটরস'-এ বাংলাদেশের স্কোর (০-১০০, ১০০ সেরা)
২০১৯ ৮২% ৪৮ ৩২.৫
২০২০ ৭৯% ৬১ ৩২.২
২০২১ ৭৮% ৭৫ ৩১.৯
২০২২ ৭৬% ৯২ ৩১.৫
২০২৩ ৭৪% ১০৫ ৩১.১

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), World Bank (Worldwide Governance Indicators)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক জারিকৃত 'করপোরেট সুশাসন কোড ২০১৯' এর অধীনে স্বতন্ত্র পরিচালকদের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করতে হবে, যেখানে তাদের আর্থিক স্বাধীনতা ও পর্ষদের অন্যান্য সদস্যের সাথে সম্পর্ক নিরীক্ষণের জন্য একটি স্বাধীন প্যানেল গঠন করতে হবে এবং তাদের কার্যক্রমের বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন অর্থ মন্ত্রণালয়) এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক যৌথভাবে একটি বিশেষ 'ফরেনসিক অডিট ইউনিট' গঠন করতে হবে, যা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এর সাথে সমন্বয় করে শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর 'সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে লেনদেন' (Related Party Transactions) এবং জটিল আর্থিক কাঠামো নিরীক্ষা করবে এবং সন্দেহজনক ক্ষেত্রে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে।
  • ADB এর 'ক্যাপিটাল মার্কেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম' এর আওতায় প্রদত্ত সুপারিশমালা অনুসরণ করে, বাংলাদেশ সরকার 'কোম্পানি আইন ১৯৯৪' সংশোধন করে স্বাধীন নিরীক্ষকদের (Independent Auditors) ক্ষমতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ অনিয়ম বা অসঙ্গতি চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রাখা যায় এবং নিরীক্ষা কমিটির কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট কায়সার

অ্যাডভোকেট কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator