ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রয়্যালটি আদায়: শিল্পীর ন্যায্য পাওনা কি অধরাই থাকছে? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রয়্যালটি আদায়: শিল্পীর ন্যায্য পাওনা কি অধরাই থাকছে?

রকিবুল ইসলাম  avatar   
রকিবুল ইসলাম
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রয়্যালটি আদায়: শিল্পীর ন্যায্য পাওনা কি অধরাই থাকছে?
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রয়্যালটি আদায়: শিল্পীর ন্যায্য পাওনা কি অধরাই থাকছে?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের তথ্যমতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে শিল্পীদের রয়্যালটি আদায়ের ক্ষেত্রে যে আইনগত জটিলতা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান, ত...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের তথ্যমতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে শিল্পীদের রয়্যালটি আদায়ের ক্ষেত্রে যে আইনগত জটিলতা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান, তা আজও শিল্পীদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিগত ৫ বছরে ডিজিটাল মাধ্যমে গান পরিবেশনের পরিমাণ প্রায় ৩০০% বৃদ্ধি পেলেও, এর বিপরীতে রয়্যালটি বাবদ শিল্পীদের প্রাপ্তি হতাশাজনক। ২০২২-২৩ অর্থবছরে, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস কর্তৃক নিবন্ধিত শিল্পকর্ম থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রয়্যালটি আদায়ের মোট পরিমাণ ছিল মাত্র ২.৫ কোটি টাকা, যা প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ কম। এই চিত্র স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয় যে, ডিজিটাল যুগে শিল্পীদের মেধা ও শ্রমের মূল্য যথাযথভাবে পরিশোধ হচ্ছে না এবং একটি কার্যকর রয়্যালটি বিতরণ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এই খাতকে স্থবির করে দিচ্ছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার বাংলাদেশের সংগীত শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেও, এর ফলে সৃষ্ট রয়্যালটি আদায় প্রক্রিয়া যথেষ্ট স্বচ্ছ ও শক্তিশালী না হওয়ায় শিল্পীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে, ইউটিউব, স্পটিফাই, ফেসবুকের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে স্থানীয় শিল্পীদের রয়্যালটি সংগ্রহে বিদ্যমান জটিলতাগুলো প্রকট। এই প্ল্যাটফর্মগুলোর নিজস্ব অ্যালগরিদম ও লাইসেন্সিং মডেল প্রায়শই স্থানীয় কপিরাইট আইন ও শিল্পীদের চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়। উদাহরণস্বরূপ, অনেক সময় রয়্যালটি গণনা করা হয় প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব বিজ্ঞাপন রাজস্বের ভিত্তিতে, যেখানে ভিউ বা স্ট্রিমিংয়ের সংখ্যা সরাসরি অনুপাতিক হয় না। এতে করে, মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ বা স্ট্রিমিং পেলেও একজন শিল্পীর পকেটে আসে নামমাত্র অর্থ। এছাড়া, অধিকাংশ ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউটর সংস্থাগুলোও রয়্যালটি বিতরণে স্বচ্ছতার অভাব দেখায়, যেখানে শিল্পীরা তাদের কাজের সঠিক ডেটা বা উপার্জনের হিসাব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান না। World Bank-এর 'Digital Economy for Development' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য রয়্যালটি আদায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ আইনি কাঠামো এবং ডেটা ট্র্যাকিং সিস্টেম প্রায়শই দুর্বল থাকে।

এই সমস্যার মূলে রয়েছে কপিরাইট আইনের প্রয়োগগত দুর্বলতা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অভাব। বাংলাদেশ সরকার ২০০৬ সালের কপিরাইট আইনকে সময়ের উপযোগী করে সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও, ডিজিটাল রয়্যালটি আদায়ের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি অনুপস্থিত। ২০২৩ সালে সংশোধিত কপিরাইট আইনে 'ডিজিটাল স্বত্ব' এবং 'অনলাইন স্ট্রিমিং' সংক্রান্ত কিছু ধারা যোগ করা হলেও, এর বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে। রয়্যালটি কালেকশন অর্গানাইজেশনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনা জরুরি। বর্তমানে, হাতেগোনা কিছু সংস্থা এই কাজটি করছে, কিন্তু তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরাসরি চুক্তির ক্ষমতা সীমিত। উপরন্তু, শিল্পীদের মধ্যে রয়্যালটি অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার অভাবও একটি বড় কারণ। অনেক শিল্পী তাদের কাজের লাইসেন্সিং চুক্তি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন এবং কীভাবে তাদের রয়্যালটি ট্র্যাক করতে হয় সে বিষয়েও তাদের জ্ঞান সীমিত। ADB (Asian Development Bank) তার 'Digital Transformation in South Asia' শীর্ষক গবেষণায় দেখিয়েছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে ন্যায্য রয়্যালটি নিশ্চিত করতে হলে জাতীয় কপিরাইট অফিসগুলোকে প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরাসরি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করতে হবে।

সূচক ২০১৮-১৯ অর্থবছর ২০২০-২১ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত গানের স্ট্রিমিং/ভিউ (আনুমানিক বিলিয়ন) ০.৮ ১.৭ ৩.২
মোট আদায়কৃত ডিজিটাল রয়্যালটি (কোটি টাকা) ১.২০ ১.৮৫ ২.৫০
শিল্পী/সুরকার/গীতিকারদের প্রাপ্ত গড় রয়্যালটি (মোটের শতাংশ) ১৫% ১২% ১০%
বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস কর্তৃক গৃহীত মামলা (ডিজিটাল স্বত্ব লঙ্ঘন) ৭ ১২ ২০

উৎস: বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস এবং বিভিন্ন মিউজিক ডিস্ট্রিবিউটর সংস্থার প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার, বিশেষত সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে রয়্যালটি আদায়ের জন্য একটি কেন্দ্রীয়, স্বাধীন ও প্রযুক্তি-সক্ষম 'ডিজিটাল রয়্যালটি কালেকশন এজেন্সি' প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই এজেন্সি আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর (যেমন - YouTube, Spotify, Apple Music) সাথে সরাসরি চুক্তি করবে এবং ব্লকচেইন-ভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে রয়্যালটি ট্র্যাকিং ও বিতরণে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, যা বাংলাদেশ কপিরাইট আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০২৩) এর ৪২ ও ৪৩ ধারা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।
  • World Bank এবং ADB-এর সহায়তায়, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসকে প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিকীকরণ করতে হবে এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ও ডেটা অ্যানালিটিক্স সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কপিরাইট লঙ্ঘনের ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করা এবং রয়্যালটি আদায়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা সম্ভব হবে, পাশাপাশি শিল্পীদের জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল তৈরি করা যেতে পারে যেখানে তারা তাদের কাজের রয়্যালটি স্ট্যাটাস রিয়েল-টাইমে দেখতে পারবেন।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে শিল্পীদের চুক্তির ক্ষেত্রে একটি মানসম্মত টেমপ্লেট ও ন্যূনতম রয়্যালটি ভাগের নীতিমালা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে কোনো ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউটর বা প্ল্যাটফর্ম শিল্পীদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করতে না পারে। এর বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কপিরাইট আইন ২০০৬-এর ধারা ৬৭ অনুযায়ী একটি 'রয়্যালটি ট্যারিফ কমিটি' গঠন করে নিয়মিতভাবে ডিজিটাল রয়্যালটি হার পর্যালোচনা ও নির্ধারণের ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রকিবুল ইসলাম

রকিবুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও রয়্যালটি রাইটস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator