তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত: শ্রমের স্বয়ংক্রিয়করণ, নাকি দক্ষতার পুনর্গঠন? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত: শ্রমের স্বয়ংক্রিয়করণ, নাকি দক্ষতার পুনর্গঠন?

নাসির উদ্দিন  avatar   
নাসির উদ্দিন
তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত: শ্রমের স্বয়ংক্রিয়করণ, নাকি দক্ষতার পুনর্গঠন?
তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাত: শ্রমের স্বয়ংক্রিয়করণ, নাকি দক্ষতার পুনর্গঠন?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) তৈরি পোশাক রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তু...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) তৈরি পোশাক রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ৪.৩৫% বৃদ্ধি পেয়ে ৪৩.৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৫.৬১% কম। এই প্রবৃদ্ধির হার গত কয়েক বছরের গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশেষ করে, বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় এই খাতে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, পোশাক কারখানার মালিকদের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে, যা একদিকে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিলেও, অন্যদিকে লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণে সরকার, শিল্প মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি গভীর আলোচনার প্রয়োজন এখন অবশ্যম্ভাবী।

তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে স্বয়ংক্রিয়করণ প্রক্রিয়া মূলত দুটি প্রধান দিক থেকে এগিয়ে চলছে: উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অত্যাধুনিক রোবটিক্স ও মেশিন লার্নিং-ভিত্তিক সরঞ্জামের ব্যবহার এবং সাপ্লাই চেইনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ডেটা অ্যানালিটিক্স প্রয়োগ। উদাহরণস্বরূপ, BGMEA-এর সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, সেলাই, কাটিং এবং ফিনিশিংয়ের মতো শ্রম-ঘন প্রক্রিয়াগুলিতে স্বয়ংক্রিয় মেশিন ব্যবহারের ফলে প্রতি ইউনিটে শ্রম ব্যয় ১৫-২০% কমানো সম্ভব। অনেক বড় ও মাঝারি আকারের কারখানায় বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় কাটিং মেশিন, প্যাটার্ন মেকিং সফটওয়্যার এবং কিছু ক্ষেত্রে সেমি-অটোমেটেড সেলাই রোবট স্থাপন করা হয়েছে। এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন একদিকে পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি, উৎপাদন সময় হ্রাস এবং ত্রুটি কমানোর সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে কারখানার উৎপাদন ক্ষমতাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এই স্বয়ংক্রিয়করণের ফলে অদক্ষ এবং আধা-দক্ষ শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে যদি না বিকল্প কর্মসংস্থান বা দক্ষতা উন্নয়নের পথ তৈরি করা হয়।

অন্যদিকে, দক্ষতার পুনর্গঠন বা 'আপস্কিলিং' এবং 'রিস্কিলিং' স্বয়ংক্রিয়করণের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব প্রশমনের একটি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। BKMEA এবং DIFE (কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর)-এর যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের জন্য নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যদিও এর পরিধি এখনো সীমিত। এই কর্মসূচির অধীনে, শ্রমিকদের মেশিন অপারেটিং, প্রোগ্রামিং, ডেটা এন্ট্রি, কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের মতো নতুন দক্ষতা শেখানো হচ্ছে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমিকরা কেবল তাদের বর্তমান চাকরি হারানোর ঝুঁকি থেকে বাঁচছেন না, বরং স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার সুপারভাইজার বা টেকনিশিয়ান হিসেবে উচ্চতর পদে উন্নীত হওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)-এর তথ্যমতে, যেসব কারখানায় শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়েছে, সেখানে উৎপাদনশীলতা এবং পণ্যের গুণগত মান উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। এই কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি আধুনিক, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং দক্ষ জনবল-ভিত্তিক পোশাক শিল্প গড়ে তোলার দিকে এগোতে পারে, যেখানে স্বয়ংক্রিয়করণ এবং মানবসম্পদের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব।

বছর তৈরি পোশাক রপ্তানি (বিলিয়ন USD) স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ব্যবহার (% কারখানায়) দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী শ্রমিকের সংখ্যা
২০২০-২১ ৩৮.৭৬ ১৫% ৫০,০০০
২০২১-২২ ৪৫.৭১ ২২% ৭৫,০০০
২০২২-২৩ ৪৬.৯৯ ৩২% ১,২০,০০০
২০২৩-২৪ (জুলাই-এপ্রিল) ৪৩.৮৫ ৪০% (আনুমানিক) ১,৫০,০০০ (আনুমানিক)

উৎস: বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB), BGMEA এবং BKMEA এর অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • সরকারকে একটি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল (National Skill Development Fund) গঠন করতে হবে, যা DIFE (কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর) এবং BGMEA/BKMEA-এর যৌথ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। এই তহবিল থেকে পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের শ্রমিকদের জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যেমন - রোবটিক্স অপারেশন, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ডিজিটাল ডিজাইন সফটওয়্যার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা স্বয়ংক্রিয়করণের ফলে সৃষ্ট নতুন কাজের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
  • শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এর অধীনে শ্রমিক ছাঁটাই সংক্রান্ত ধারাগুলো পুনর্বিবেচনা করে এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা স্বয়ংক্রিয়করণের কারণে কর্মচ্যুত শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। এর মধ্যে থাকতে পারে বাধ্যতামূলক পুনর্বাসন প্রশিক্ষণ, নতুন কর্মসংস্থানে সহায়তা এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তা, যা DIFE দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
  • রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-কে যৌথভাবে একটি বিশেষ নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে প্রযুক্তিগত আপগ্রেডেশন এবং শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগকারী কারখানাগুলোকে প্রণোদনা দেবে। এই প্রণোদনা হতে পারে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা, কর অবকাশ, বা রপ্তানি আয়ের উপর অতিরিক্ত নগদ সহায়তা, যা BGMEA এবং BKMEA-এর সুপারিশের ভিত্তিতে প্রদান করা যেতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসির উদ্দিন

নাসির উদ্দিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator