পোশাক শিল্পের বর্জ্য: বৃত্তাকার অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পোশাক শিল্পের বর্জ্য: বৃত্তাকার অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা

নাবিলা তাবাসসুম  avatar   
নাবিলা তাবাসসুম
পোশাক শিল্পের বর্জ্য: বৃত্তাকার অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা
পোশাক শিল্পের বর্জ্য: বৃত্তাকার অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: নাবিলা তাবাসসুম | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি)। সম্প্রতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিত...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং গ্লোবাল গ্রিন গ্রোথ ইনস্টিটিউট (জিজিজিআই) এর যৌথ উদ্যোগে একটি কর্মশালার মাধ্যমে পোশাক শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বৃত্তাকার অর্থনীতির মডেল প্রয়োগের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, যেখানে পোশাক শিল্পের বিশাল বর্জ্যকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব আনা সম্ভব। প্রতি বছর বাংলাদেশের পোশাক শিল্প থেকে প্রায় ৫ লাখ টন প্রাক-ভোক্তা বর্জ্য (pre-consumer waste) উৎপাদিত হয়, যার একটি বড় অংশ ফেলে দেওয়া হয় বা নিম্নমানের পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় চলে যায়। এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ এবং একটি কার্যকর বৃত্তাকার অর্থনীতি মডেলের বাস্তবায়ন দেশের পরিবেশ সুরক্ষায় যেমন সহায়ক হবে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক হিসেবে পরিচিত হলেও, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। যদিও জিজিজিআই-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে, তবে কার্যকর বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ এবং পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার জন্য একটি সুসংহত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা এখনও অনুপস্থিত। বিশেষত, পোশাক কারখানার উৎপাদিত স্ক্র্যাপ ফ্যাব্রিক, সুতা এবং অন্যান্য বর্জ্যকে উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তরিত করার জন্য উন্নত প্রযুক্তির অভাব পরিলক্ষিত হয়। এই বর্জ্যগুলোকে যদি ফাইবার-টু-ফাইবার রিসাইক্লিং পদ্ধতির মাধ্যমে পুনরায় সুতা ও কাপড় উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়, তবে তা কেবল কাঁচামাল আমদানির উপর নির্ভরতা কমাবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে 'সবুজ' বা পরিবেশবান্ধব পোশাকের চাহিদা পূরণেও বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখবে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৫ সালের মধ্যে টেক্সটাইল পণ্যের জন্য বাধ্যতামূলক পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সুযোগ তৈরি করতে পারে যদি আমরা দ্রুত বৃত্তাকার অর্থনীতি মডেলে স্থানান্তরিত হতে পারি।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালাগুলো কেবল কঠিন বর্জ্যের সাধারণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে, কিন্তু পোশাক শিল্পের নির্দিষ্ট বর্জ্য এবং তাদের পুনর্ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব রয়েছে। শিল্প-কারখানাগুলোকে উৎসাহিত করার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে, ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানাগুলোর কাছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বা কারিগরি জ্ঞান থাকে না। এই সমস্যা সমাধানে, কেন্দ্রীয় বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে বিভিন্ন কারখানার বর্জ্য সংগ্রহ করে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পুনর্ব্যবহার করা হবে। এর ফলে, বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের খরচ কমে আসবে এবং পরিবেশগত প্রভাবও হ্রাস পাবে। এছাড়াও, পোশাক শিল্পের বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন বা বায়োগ্যাস উৎপাদনেও সুযোগ রয়েছে, যা কৃষি ও জ্বালানি খাতে অবদান রাখতে পারে এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এই বিষয়ে গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

বর্জ্যের ধরন বার্ষিক উৎপাদন (আনুমানিক টন) পুনর্ব্যবহার হার (বর্তমান) বৃত্তাকার অর্থনীতির সম্ভাবনা
পোশাক শিল্পের প্রাক-ভোক্তা স্ক্র্যাপ ৫,০০,০০০ ১৫-২০% (নিম্নমানের ব্যবহার) ৯০% পর্যন্ত ফাইবার-টু-ফাইবার রিসাইক্লিং
জৈব বর্জ্য (খাদ্য বর্জ্য, কৃষি বর্জ্য) ১,৫০,০০,০০০ ১০-১৫% ৫০-৬০% জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন
প্লাস্টিক বর্জ্য ৮,০০,০০০ ২৫-৩০% ৭০-৮০% রিসাইক্লিং ও নতুন পণ্য উৎপাদন

উৎস: বিজিএমইএ, পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন (২০২২-২০২৩ সালের তথ্যভিত্তিক)

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে 'পোশাক শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ফাইবার-টু-ফাইবার রিসাইক্লিং প্রযুক্তি গ্রহণকারী কারখানাগুলোকে কর সুবিধা এবং কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের মতো সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই নীতিমালা ২০২৫ সালের মধ্যে কার্যকর করতে হবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর যৌথ উদ্যোগে পোশাক শিল্পের জৈব বর্জ্য (যেমন, প্রাকৃতিক তন্তুর প্রক্রিয়াকরণ বর্জ্য) থেকে উচ্চমানের জৈব সার তৈরির প্রযুক্তি গবেষণা ও উন্নয়ন করতে হবে এবং কৃষকদের মধ্যে এর ব্যবহার প্রসারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে।
  • পোশাক কারখানাসমূহের জন্য বর্জ্য পৃথকীকরণ (segregation) এবং সংগ্রহ ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যার আওতায় প্রতিটি শিল্প পার্কে কেন্দ্রীয় বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ও রিসাইক্লিং কেন্দ্র স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে এবং এই কেন্দ্রগুলোর প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) এর মাধ্যমে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করতে হবে।
Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator