ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: ডেলিভারি সংকট কি তৃতীয় পক্ষের… | আই নিউজ বিডি

ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: ডেলিভারি সংকট কি তৃতীয় পক্ষের ব্যর্থতা, নাকি কাঠামোগত দুর্বলতা?

ইমরান খান  avatar   
ইমরান খান
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: ডেলিভারি সংকট কি তৃতীয় পক্ষের ব্যর্থতা, নাকি কাঠামোগত দুর্বলতা?
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: ডেলিভারি সংকট কি তৃতীয় পক্ষের ব্যর্থতা, নাকি কাঠামোগত দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: ইমরান খান | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: ইমরান খান | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল)

সম্প্রতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক ই-কমার্স খাতের জন্য প্রণীত ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা (২০২১) কার্যকর হওয়ার পরও ডেলিভারি সংক্রান্ত জটিলতা ও গ্রাহক অসন্তোষের ঘটনাগুলি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে, তৃতীয় পক্ষের লজিস্টিকস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলির (থার্ড-পার্টি লজিস্টিকস – 3PL) সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারা, পণ্যের ক্ষতিসাধন এবং ক্ষেত্রবিশেষে গ্রাহক সেবায় ঘাটতির অভিযোগগুলি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলির সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। এই সংকট কি কেবলমাত্র ডেলিভারি পার্টনারদের সক্ষমতার অভাবের ফল, নাকি এর গভীরে রয়েছে বাংলাদেশের উদীয়মান ডিজিটাল রিটেইল খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা?

বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত দ্রুত বিকাশ লাভ করলেও এর লজিস্টিকস অবকাঠামো এখনও বহুলাংশে অনানুষ্ঠানিক এবং অপর্যাপ্ত। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর এক গবেষণা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০% ই-কমার্স ডেলিভারি এখনও ঢাকা ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক, যা আঞ্চলিক বৈষম্যকে প্রকট করে তোলে। এই সীমিত ভৌগোলিক পরিধি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডেলিভারির উচ্চ খরচ ও সময়ক্ষেপণ তৃতীয় পক্ষের লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। অনেক ছোট ও মাঝারি আকারের ডেলিভারি সংস্থা পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে ধুঁকছে। ফলস্বরূপ, তারা বৃহৎ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলির ক্রমবর্ধমান অর্ডারের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে উৎসবের সময় বা কোনো বিশেষ বিক্রয় ক্যাম্পেইনের সময় এই সংকট আরও তীব্র হয়, যখন ডেলিভারির চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে যায় এবং বিদ্যমান অবকাঠামো সেই চাপ নিতে ব্যর্থ হয়। এছাড়া, পণ্য ট্র্যাকিং সিস্টেমের দুর্বলতা, কোল্ড চেইন লজিস্টিকসের অভাব এবং রিটার্ন ম্যানেজমেন্টের অদক্ষতাও ডেলিভারি সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর আওতাধীন কাস্টমস বিভাগ থেকে পণ্য ছাড়করণে দীর্ঘসূত্রিতা, বিশেষ করে ক্রস-বর্ডার ই-কমার্সের ক্ষেত্রে, ডেলিভারি প্রক্রিয়াকে আরও ধীর করে দেয় এবং গ্রাহকের কাছে সময়মতো পণ্য পৌঁছানোকে অসম্ভব করে তোলে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট করছে, তেমনি অন্যদিকে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলির ব্র্যান্ড ইমেজকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই খাতের প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকিস্বরূপ।

ডেলিভারি সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং তৃতীয় পক্ষের লজিস্টিকস সরবরাহকারীদের মধ্যে চুক্তির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। অনেক ক্ষেত্রেই, ডেলিভারি পার্টনারদের সাথে সুস্পষ্ট সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট (SLA) থাকে না, অথবা থাকলেও তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় না। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক তালিকাভুক্ত কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে লজিস্টিকস ব্যয় ও এর কার্যকারিতা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর তথ্যানুসারে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) উৎপাদিত পণ্যের অনলাইন বিক্রয় বৃদ্ধিতে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, ডেলিভারি জটিলতার কারণে তাদের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না, যা দেশের রপ্তানি সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। অনেক এফ-কমার্স বিক্রেতা, যারা মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাদের নিজস্ব ডেলিভারি ব্যবস্থা না থাকায় তৃতীয় পক্ষের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকেন। এই নির্ভরশীলতা তাদের জন্য প্রায়শই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যার ফলে গ্রাহক অসন্তোষ দেখা দেয়। এই সমস্যা মোকাবেলায়, খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি সমন্বিত ও সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য, যেখানে প্রতিটি ধাপের জন্য স্পষ্ট দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। এছাড়াও, ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়েগুলির সাথে ডেলিভারি সিস্টেমের নির্বিঘ্ন একীকরণ না থাকায় অনেক সময় ক্যাশ-অন-ডেলিভারি (COD) নির্ভরতা বেড়ে যায়, যা ডেলিভারি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল ও ব্যয়বহুল করে তোলে।

খাত/সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (প্রাক্কলিত)
ই-কমার্স বাজারের আকার (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ২.০ ২.৫ ৩.২ ৪.৫
ডেলিভারি ব্যর্থতার হার (%) ১২% ১৫% ১৮% ২০%
তৃতীয় পক্ষের লজিস্টিকস (3PL) বাজারের অংশীদারিত্ব (%) ৬০% ৬৫% ৭০% ৭৫%
গ্রাহক অসন্তোষ (ডেলিভারি সংক্রান্ত) (%) ১৫% ২০% ২৫% ৩০%

উৎস: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, CPD, বিভিন্ন ই-কমার্স সমীক্ষা।

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা (২০২১) এর অধীনে একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করা হোক, যা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং তৃতীয় পক্ষের লজিস্টিকস সরবরাহকারীদের মধ্যে চুক্তি, সার্ভিস লেভেল অ্যাগ্রিমেন্ট (SLA) এবং ডেলিভারি পারফরমেন্স নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে এবং নির্দেশনা অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর সমন্বয়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হোক, যা ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স পণ্যের দ্রুত কাস্টমস ছাড়করণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক ডেলিভারি সহজ করতে লজিস্টিকস সাবসিডি বা প্রণোদনা নীতি চালু করবে।
  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) তালিকাভুক্ত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য লজিস্টিকস ব্যয়, ডেলিভারি পারফরমেন্স এবং তৃতীয় পক্ষের সাথে চুক্তির শর্তাবলী সম্পর্কে ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করবে, যা বিনিয়োগকারীদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং খাতটির জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ইমরান খান

ইমরান খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator