সম্প্রতি, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৩৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের কপিরাইট আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল বিশ্বে প্রচলিত আইনি কাঠামো কীভাবে নতুন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে এবং এর সুরক্ষায় বিদ্যমান আইন কতটা প্রস্তুত। বিশেষ করে, ইউটিউব, ফেসবুক এবং অন্যান্য অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে অননুমোদিত কন্টেন্ট আপলোড, পাইরেসি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা সৃষ্ট কন্টেন্টের স্বত্বাধিকার নিয়ে বিতর্ক বর্তমানে বাংলাদেশের মেধাস্বত্ব সুরক্ষার মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দ্রুত বিস্তার এবং সহজলভ্যতা একদিকে যেমন সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, তেমনি অন্যদিকে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের কপিরাইট আইন, ২০০২ (সংশোধিত ২০২২) মূলত প্রথাগত কপিরাইট লঙ্ঘনের বিষয়গুলো মোকাবেলায় তৈরি হয়েছিল। তবে, ডিজিটাল যুগে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের ধরন ও পরিধি এতটাই ভিন্ন যে, প্রচলিত আইন প্রায়শই এর মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ইউটিউব ভিডিও বা ফেসবুক পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে এবং অননুমোদিত কপি বা পুনঃপ্রকাশের মাধ্যমে মূল সৃষ্টিকর্তা তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। বিশেষ করে, বিদেশী প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাংলাদেশী কন্টেন্টের পাইরেসি এবং এর বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে এখতিয়ারগত সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাব প্রকটভাবে দেখা যায়। এই পরিস্থিতিতে, স্থানীয়ভাবে আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়বদ্ধতা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির সাথে সঙ্গতি রেখে পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা সৃষ্ট কন্টেন্টের স্বত্বাধিকারের বিষয়টি বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে একটি অমীমাংসিত আইনি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের কপিরাইট আইনে 'সৃষ্টিকর্তা' বলতে সাধারণত একজন মানুষকেই বোঝানো হয়, যিনি তার মেধা ও শ্রম দিয়ে কোনো কিছু তৈরি করেন। কিন্তু যখন একটি এআই মডেল বিশাল ডেটা সেট বিশ্লেষণ করে একটি নতুন ছবি, গান বা লেখা তৈরি করে, তখন এর স্বত্বাধিকার কার হবে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এআই মডেলের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত ডেটা যদি কপিরাইটযুক্ত হয়, তবে সেই ডেটা ব্যবহারের বৈধতা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। World Bank-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এআই-এর দ্রুত প্রসারের সাথে সাথে এই ধরনের আইনি জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এআই-এর ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, এর ভবিষ্যৎ প্রভাব বিবেচনা করে এখনই এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সৃজনশীল অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব নিশ্চিত করা যায় এবং একই সাথে মেধাস্বত্ব সুরক্ষিত থাকে।
ডিজিটাল কন্টেন্টের আন্তর্জাতিক পাইরেসি বাংলাদেশের সৃজনশীল শিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে চলচ্চিত্র, সঙ্গীত এবং প্রকাশনা শিল্পে এই সমস্যা প্রকট। বিদেশি সার্ভার থেকে পরিচালিত সাইটগুলো থেকে অননুমোদিত কন্টেন্ট ডাউনলোডের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তারা আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। যদিও বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর অধীনে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ প্রায়শই জটিল হয়। Asian Development Bank (ADB)-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, আঞ্চলিক দেশগুলোতে ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল পাইরেসি রোধে সমন্বিত আইনি কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সমাধান অপরিহার্য। বাংলাদেশের জন্য, আন্তর্জাতিক কপিরাইট চুক্তি (যেমন বার্ন কনভেনশন, ডব্লিউআইপিও কপিরাইট ট্রিটি) মেনে চলা এবং সেই চুক্তিগুলোর আলোকে দেশীয় আইনকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এছাড়াও, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের ব্যবহারকারীদের দ্বারা আপলোড করা কন্টেন্টের জন্য আরও বেশি দায়বদ্ধ করার বিধান যুক্ত করা জরুরি, যাতে তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কপিরাইট লঙ্ঘনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
| বছর | মোট অভিযোগ | ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংশ্লিষ্ট অভিযোগ | ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংশ্লিষ্ট অভিযোগের শতাংশ |
|---|---|---|---|
| ২০২১ | ১২০ | ৩০ | ২৫% |
| ২০২২ | ১৮০ | ৬০ | ৩৩.৩৩% |
| ২০২৩ | ৪০০ | ২৭০ | ৬৭.৫% |
উৎস: বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস (বার্ষিক প্রতিবেদন ও অভ্যন্তরীণ ডেটা)
সুপারিশ
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ডিজিটাল কপিরাইট এনফোর্সমেন্ট ইউনিট গঠন করা, যা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো দ্রুত শনাক্ত এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সক্ষম হবে। এই ইউনিটকে ডিজিটাল ফরেনসিক এবং সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল দ্বারা শক্তিশালী করতে হবে।
- বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক কপিরাইট আইন, ২০০২ (সংশোধিত ২০২২)-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা সৃষ্ট কন্টেন্টের স্বত্বাধিকার এবং এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত ডেটার কপিরাইট সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট ধারা সংযোজন করা, যা 'সৃষ্টিকর্তা' ও 'কপিরাইট ধারক'-এর সংজ্ঞা সম্প্রসারিত করবে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-কে যৌথভাবে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদনে উদ্যোগী হতে হবে, যাতে বিদেশী সার্ভার থেকে পরিচালিত পাইরেটেড কন্টেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায় এবং প্ল্যাটফর্মগুলোকে তাদের ব্যবহারকারীদের কন্টেন্টের জন্য অধিকতর দায়বদ্ধ করা যায়।