মানব পাচার প্রতিরোধ আইন: প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মানব পাচার প্রতিরোধ আইন: প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

রেজাউল করিম শিকদার  avatar   
রেজাউল করিম শিকদার
মানব পাচার প্রতিরোধ আইন: প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
মানব পাচার প্রতিরোধ আইন: প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: রেজাউল করিম শিকদার | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: রেজাউল করিম শিকদার | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন)

সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC) মানব পাচার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়েছে। কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২২ সালে প্রায় ৫,০০০ পাচারের শিকার ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও শিশু। এটি স্পষ্টত নির্দেশ করে যে, মানব পাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২ (সংশোধিত ২০২৩) থাকা সত্ত্বেও, আইন প্রয়োগ ও পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষায় এখনও ব্যাপক ঘাটতি বিদ্যমান। বিশেষ করে, প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অত্যন্ত দুর্বল, যা তাদের সমাজে পুনঃএকত্রীকরণের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে এবং পুনরায় পাচারের ঝুঁকিতে ফেলছে।

মানব পাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২ (সংশোধিত ২০২৩) এর অধীনে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের জন্য সুরক্ষা, প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রায়শই দেখা যায়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয় এবং প্রত্যাবাসিত হওয়ার পর ভুক্তভোগীরা পর্যাপ্ত আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা পান না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উদাহরণস্বরূপ, World Bank এর এক গবেষণা অনুযায়ী, প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ২০% সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় আসে, বাকি ৮০% তাদের নিজস্ব উদ্যোগে বা বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় পুনর্বাসনের চেষ্টা করে। এই চিত্র রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগের বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। পাচারের শিকার ব্যক্তিদের জন্য গঠিত ট্রাস্ট ফান্ড, যা আইন অনুযায়ী কাজ করার কথা, তার তহবিল সংগ্রহ ও বিতরণেও স্বচ্ছতার অভাব পরিলক্ষিত হয়, যা প্রত্যাশিত মাত্রায় তাদের সহায়তা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে।

বাংলাদেশের মানব পাচার প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন ও নীতিগুলির প্রয়োগে চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে অন্যতম হলো আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতার অভাব। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির প্রশিক্ষণে ঘাটতি এবং মামলার তদন্ত ও প্রসিকিউশনে দীর্ঘসূত্রিতা প্রায়শই অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। Asia Foundation এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) এর যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, মানব পাচার সংক্রান্ত মামলার রায় প্রদানে গড় সময় লাগে ৫-৭ বছর, যা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করে। এছাড়াও, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নজরদারিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার পর্যাপ্ত না হওয়ায় পাচারকারীরা সহজেই অবৈধ পথ ব্যবহার করে। Asian Development Bank (ADB) এর মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় মানব পাচারের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে বাংলাদেশ ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এই অঞ্চলে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে আঞ্চলিক সহযোগিতার অভাব রয়েছে। কার্যকর প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা না থাকায়, পাচারকারীরা একই ব্যক্তিকে বারবার পাচারের সুযোগ পায়, যা চক্রাকারে তাদের শোষণ করে চলেছে।

বিষয়বস্তু ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩
শনাক্তকৃত পাচারের শিকার ব্যক্তি ৩,৫০০ ৪,২০০ ৫,১০০ ৫,৩৫০ (প্রাক্কলিত)
প্রত্যাবাসিত ব্যক্তি ৮৫০ ১,০০০ ১,২০০ ১,৫০০
পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ১৫% ১৮% ২০% ২২%
মানব পাচার মামলার নিষ্পত্তি হার ৬% ৮% ১০% ১২%

উৎস: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও World Bank প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • মানব পাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২ (সংশোধিত ২০২৩) এর অধীনে গঠিত মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বিত ও কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন করা হোক, যার নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হবে।
  • World Bank এবং Asian Development Bank (ADB) এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পাচারের শিকার ব্যক্তিদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'পুনর্বাসন প্যাকেজ' তৈরি ও বাস্তবায়ন করা হোক, যা প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তাদের টেকসই সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনঃএকত্রীকরণ নিশ্চিত করবে। এই প্যাকেজের অধীনে, বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় এনজিও এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করবে।
  • মানব পাচার প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনালসমূহের কার্যকারিতা বাড়াতে বিচারক ও প্রসিকিউটরদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হোক, যাতে মানব পাচার সংক্রান্ত মামলার দ্রুত ও কার্যকর নিষ্পত্তি নিশ্চিত হয় এবং অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়। এছাড়াও, আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অভিযান জোরদার করা হোক।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেজাউল করিম শিকদার

রেজাউল করিম শিকদার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator