ডিজিটাল লেনদেনে QR কোডের জয়যাত্রা: ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য কী বার্তা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল লেনদেনে QR কোডের জয়যাত্রা: ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য কী বার্তা?

সামিয়া জামান  avatar   
সামিয়া জামান
ডিজিটাল লেনদেনে QR কোডের জয়যাত্রা: ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য কী বার্তা?
ডিজিটাল লেনদেনে QR কোডের জয়যাত্রা: ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য কী বার্তা?
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: সামিয়া জামান | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ফিনটেক ও ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: সামিয়া জামান | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: ফিনটেক ও ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম)

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের ফিনটেক সূচকে দেখা গেছে, কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ২৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমে এক নীরব বিপ্লবের ইঙ্গিত বহন করে। এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি শুধু শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যেও এর ব্যবহার লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে, জাতীয় পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (NPSB) ব্যবহার করে ইন্টারঅপারেবল কিউআর (iQR) লেনদেনের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, এই প্রযুক্তি এখন আর শুধু বড় শহরের ফাস্ট-ফুড চেইন বা সুপারশপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি মুদি দোকান, চা বিক্রেতা এবং রাস্তার ধারের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দৈনন্দিন আয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, যেখানে নগদ অর্থের উপর নির্ভরতা কমে আসছে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এক নতুন মাত্রা পাচ্ছে।

এই ডিজিটাল রূপান্তরের পেছনে কাজ করছে সরকারের যুগান্তকারী নীতিমালা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) কর্তৃক ফোর-জি নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ হ্রাস গ্রামীণ ও শহর উভয় অঞ্চলের ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল লেনদেনের পথ সুগম করেছে। এর ফলস্বরূপ, মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) প্রদানকারীরা তাদের এজেন্ট নেটওয়ার্ককে আরও বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছে, যা কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্টের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বিকাশ, রকেট, নগদ-এর মতো MFS অপারেটররা তাদের অ্যাপ্লিকেশনে কিউআর পেমেন্টের ফিচার যুক্ত করে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য একটি সহজ ও সাশ্রয়ী সমাধান এনেছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্ন ফিনটেক সমাধান নিয়ে আসছে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (SME) খাতের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। এসব সমাধান ব্যবসায়ীদের জন্য পেমেন্ট গ্রহণ প্রক্রিয়াকে শুধু সহজই করেনি, বরং তাদের লেনদেনের রেকর্ড রাখতেও সহায়তা করছে, যা পরবর্তীতে ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। ডিজিটাল লেনদেনের এই জোয়ার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসা পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনছে এবং তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতার ছোঁয়া দিচ্ছে।

ডিজিটাল লেনদেনের এই প্রসারে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাদের বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি গ্রহণে উৎসাহিত করেছে। বিশেষত, "ডিজিটাল বাংলাদেশ" ভিশন বাস্তবায়নে তারা যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ফিনটেক ইকোসিস্টেমের উন্নয়ন। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক অথরিটি (BHTPA) এর অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন হাই-টেক পার্কে ফিনটেক স্টার্টআপদের জন্য ইনকিউবেশন ও ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে, যা নতুন নতুন কিউআর ভিত্তিক পেমেন্ট সলিউশন তৈরিতে অবদান রাখছে। এই সমন্বিত প্রচেষ্টা শুধুমাত্র লেনদেনের গতিই বৃদ্ধি করছে না, বরং একটি সুরক্ষিত ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমও তৈরি করছে। এর ফলে, জালিয়াতি এবং অর্থপাচারের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হচ্ছে, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আর্থিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং নীতিগত সহায়তা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করছে।

সূচক ২০২০-২১ অর্থবছর ২০২১-২২ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর প্রবৃদ্ধি (২০২২-২৩ বনাম ২০২১-২২)
কিউআর কোড ভিত্তিক লেনদেনের সংখ্যা (মিলিয়ন) ১০.৭ ৩২.৮ ১০৮.২ ২২৯.৮৮%
কিউআর কোড ভিত্তিক লেনদেনের মূল্য (বিলিয়ন টাকা) ০.৮ ২.৬ ৯.৭ ২৭৩.০৮%
NPSB ইন্টারঅপারেবল QR লেনদেন (মিলিয়ন) ১.২ ৫.১ ১৮.৫ ২৬২.৭৪%
MFS ব্যবহারকারী (মিলিয়ন) ৯২.৫ ১০২.৩ ১১৯.৭ ১৭.০১%

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক ফিনটেক সূচক প্রতিবেদন, ২০২২-২৩ এবং BTRC ইন্টারনেট ব্যবহারকারী পরিসংখ্যান

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ICT Division কর্তৃক যৌথভাবে একটি ‘ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ডিজিটাল পেমেন্ট সহায়তা তহবিল’ গঠন করা যেতে পারে, যা গ্রামীণ ও প্রান্তিক ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য কিউআর পেমেন্ট সেটআপ, প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক লেনদেন খরচ বাবদ ভর্তুকি প্রদান করবে, যাতে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে তাদের প্রাথমিক অনীহা দূর হয়। এই তহবিল ফিনটেক স্টার্টআপদের জন্য নতুন কিউআর সমাধান তৈরিতেও BHTPA এর মাধ্যমে গবেষণা ও উন্নয়ন অনুদান প্রদান করতে পারে।
  • BTRC-কে তাদের 'ডিজিটাল সংযোগ' প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে উচ্চগতির ইন্টারনেট সরবরাহ নিশ্চিত করার সময়সীমা ২০২৩-এর মধ্যে বেঁধে দিতে হবে, এবং মোবাইল অপারেটরদের জন্য গ্রামীণ অঞ্চলে ডেটা প্যাকেজের মূল্য আরও সাশ্রয়ী করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করতে হবে। এর ফলে, ছোট ব্যবসায়ীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে ডিজিটাল লেনদেন পরিচালনা করতে পারবে।
  • BASIS এবং a2i এর যৌথ উদ্যোগে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য একটি জাতীয় ডিজিটাল সাক্ষরতা ও ফিনটেক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করতে হবে, যা 'ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স'-এর নির্দেশনায় পরিচালিত হবে। এই কর্মসূচিতে কিউআর পেমেন্টের সুবিধা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞান প্রদান করা হবে, যা তাদের ডিজিটাল লেনদেন গ্রহণে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সামিয়া জামান

সামিয়া জামান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফিনটেক ও ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator