ভূ-রাজনৈতিক দাবা: মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্রে পরাশক্তির নতুন চাল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ভূ-রাজনৈতিক দাবা: মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্রে পরাশক্তির নতুন চাল

জুবায়ের আহমেদ  avatar   
জুবায়ের আহমেদ
ভূ-রাজনৈতিক দাবা: মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্রে পরাশক্তির নতুন চাল
ভূ-রাজনৈতিক দাবা: মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্রে পরাশক্তির নতুন চাল
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: জুবায়ের আহমেদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: জুবায়ের আহমেদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি)

সম্প্রতি, ওপেক প্লাস (OPEC+) জোটের ২০২৩ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দৈনিক প্রায় ২.২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজার এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই সিদ্ধান্তটি কেবল অপরিশোধিত তেলের দাম নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত অবস্থান এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। বিশেষত, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার আশঙ্কায় দোদুল্যমান এবং ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলকে নজিরবিহীন চাপের মুখে ফেলেছে, তখন এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলো কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং গভীর ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) এর তথ্য অনুযায়ী, এই উৎপাদন কমানোর ফলে ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে দেবে। এই প্রেক্ষাপটে, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদকে ঘিরে পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সামরিক উপস্থিতি নতুন করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলার চাল হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্র বরাবরই বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর গতিপ্রকৃতিতে এক মৌলিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি এবং কূটনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। তবে, চীনের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা এবং রাশিয়ার পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলায় নতুন বাজার সন্ধানের প্রচেষ্টা এই অঞ্চলে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এখন কেবল পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে নেই, বরং বেইজিং এবং মস্কোর সাথেও কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে জ্বালানি অবকাঠামো এবং বাণিজ্য পথে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ দিচ্ছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর একচেটিয়া প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। একই সময়ে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইয়েমেন সংকটের মতো আঞ্চলিক সংঘাতগুলো এই ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আরও জটিল করে তুলেছে, যেখানে প্রতিটি পরাশক্তিই তাদের নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য বিভিন্ন পক্ষকে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে 'বহুমাত্রিক সংলাপ' শুরু করবে, যা স্পষ্টতই এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারের একটি প্রচেষ্টা। এই বহুমুখী সম্পর্কগুলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন দিচ্ছে, যা অতীতে খুব কমই দেখা গেছে।

এই ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলায় শুধু ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তিরাই নয়, বরং উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তিগুলোও নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা করছে। ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে, যাতে তারা জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য একাধিক উচ্চ-পর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের সুযোগ অন্বেষণ করা। অন্যদিকে, তুরস্ক এবং মিশরের মতো দেশগুলো নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য জ্বালানি ট্রানজিট রুট এবং ভূমধ্যসাগরীয় গ্যাস অনুসন্ধানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এই প্রেক্ষাপটে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বিশ্বব্যাপী রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও স্বল্প মেয়াদে তেলের চাহিদা অটুট থাকবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরশীলতা কমানোর চাপ মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে তাদের অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি পরাশক্তিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ উভয়ই তৈরি করছে, কারণ যারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেবে, তারাই ভবিষ্যতের বৈশ্বিক জ্বালানি ল্যান্ডস্কেপে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। এই জটিল সমীকরণে, মধ্যপ্রাচ্য কেবল তেলের উৎসভূমি নয়, বরং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত জোট গঠনের এক নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে।

এই পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা ক্রমবর্ধমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সার্ক (SAARC) এবং বিমসটেক (BIMSTEC) এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলো যদিও সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতিতে জড়িত নয়, তবে তাদের সদস্য দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। উদাহরণস্বরূপ, যদি মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়, তবে এই জোটগুলোর সদস্য দেশগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশগুলো, সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই, এই জোটগুলোর উচিত মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশীদার হওয়া। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) যদিও সরাসরি জ্বালানি ক্ষেত্র রক্ষা করে না, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলকে সুরক্ষিত রাখে। সিরিয়া, ইয়েমেন এবং লিবিয়ার মতো দেশগুলোতে জাতিসংঘের উপস্থিতি আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও ছড়িয়ে পড়া থেকে রোধ করতে সাহায্য করে, যা জ্বালানি রুট এবং অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই বহু-স্তরের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রাজনীতিকে কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, বরং একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক কাঠামোর অংশ হিসেবে তুলে ধরে।

দেশ/অঞ্চল ২০২২ সালের দৈনিক গড় তেল উৎপাদন (মিলিয়ন ব্যারেল) ২০২৩ সালের দৈনিক গড় তেল উৎপাদন (মিলিয়ন ব্যারেল) ২০২৪ সালের পূর্বাভাস (মিলিয়ন ব্যারেল) বৈশ্বিক উৎপাদনে শতকরা অংশ (২০২৩)
সৌদি আরব ১০.৮ ১০.২ ১০.৫ ১০.২%
সংযুক্ত আরব আমিরাত ৩.২ ৩.০ ৩.২ ৩.০%
ইরাক ৪.৫ ৪.৩ ৪.৪ ৪.৩%
ইরান ২.৫ ২.৮ ৩.০ ২.৮%
কুয়েত ২.৮ ২.৭ ২.৮ ২.৭%
অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্য ১.৫ ১.৪ ১.৫ ১.৪%
মোট মধ্যপ্রাচ্য ২৫.৩ ২৪.৪ ২৪.৯ ২৪.৪%

উৎস: আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) এবং ওপেক (OPEC) মাসিক প্রতিবেদন, ২০২৩-২০২৪

সুপারিশ

  • মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বৈশ্বিক সরবরাহে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ওপেক+ (OPEC+) কাঠামোর মধ্যে আরও স্বচ্ছ ও পূর্বাভাসযোগ্য উৎপাদন নীতি গ্রহণ করতে হবে। এই নীতিতে বৈশ্বিক চাহিদা, বাজারের প্রবণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় নিয়ে একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে, যা কেবল স্বল্পমেয়াদী মূল্য নিয়ন্ত্রণ নয়, দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সরবরাহ নিশ্চিত করবে।
  • জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর (যেমন: আরব লীগ, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষিত থাকে। বিশেষত, ইয়েমেন এবং সিরিয়ার মতো সংঘাতপূর্ণ এলাকায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UN Security Council) কর্তৃক অনুমোদিত আরও শক্তিশালী পর্যবেক্ষক মিশন মোতায়েন করে জ্বালানি রুটগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
  • বাংলাদেশসহ BIMSTEC এবং সার্ক (SAARC) সদস্য দেশগুলোকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারীদের সাথে দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক জ্বালানি নিরাপত্তা চুক্তি (Energy Security Pacts) স্বাক্ষর করতে হবে। এই চুক্তিগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ গ্যারান্টি, মূল্য স্থিতিশীলতার প্রক্রিয়া এবং জরুরি সরবরাহের জন্য কৌশলগত রিজার্ভ গঠনের বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে, যা আঞ্চলিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা বাড়াবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জুবায়ের আহমেদ

জুবায়ের আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator