কারিগরি শিক্ষা ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব: প্রশিক্ষণের আধুনিকায়ন নাকি বেকারত্বের নতুন ফাঁদ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কারিগরি শিক্ষা ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব: প্রশিক্ষণের আধুনিকায়ন নাকি বেকারত্বের নতুন ফাঁদ?

মোশতাক আহমেদ  avatar   
মোশতাক আহমেদ
কারিগরি শিক্ষা ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব: প্রশিক্ষণের আধুনিকায়ন নাকি বেকারত্বের নতুন ফাঁদ?
কারিগরি শিক্ষা ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব: প্রশিক্ষণের আধুনিকায়ন নাকি বেকারত্বের নতুন ফাঁদ?
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: মোশতাক আহমেদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: মোশতাক আহমেদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা)

সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের ২০২৪ সালের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের (TVET) মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এই পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং ডেটা অ্যানালিটিক্সের মতো উদীয়মান প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে, প্রশ্ন উঠেছে, এই আধুনিকীকরণ কি সত্যিই দেশের যুবসমাজকে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করবে, নাকি প্রশিক্ষণের নামে একটি নতুন বেকারত্বের ফাঁদ তৈরি হচ্ছে যেখানে শিক্ষার্থীরা উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও প্রয়োজনীয় শিল্প-দক্ষতার অভাবে কর্মহীন থাকবে?

বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর বিগত কয়েক বছরে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের মেয়াদ চার বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করার একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, যা শিক্ষার্থীদের দ্রুত কর্মবাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দেবে বলে দাবি করা হচ্ছে। একইসাথে, শিল্প-কারখানার চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু হালনাগাদ করার জন্য বিভিন্ন শিল্প সংস্থার সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। কিন্তু, এই উদ্যোগগুলো কতটা কার্যকর হচ্ছে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রচলিত কারিকুলাম এখনো পুরনো যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে, যা শিল্প খাতের বর্তমান চাহিদা থেকে অনেক দূরে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক ডিগ্রির মানোন্নয়ন এবং শিল্পের সাথে সংযোগ স্থাপন জরুরি, অন্যথায় গ্র্যাজুয়েটরা কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে ব্যর্থ হবেন। বিশেষ করে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, মেকাট্রনিক্স এবং অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো ক্ষেত্রগুলোতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য, কিন্তু সে অনুযায়ী পর্যাপ্ত শিক্ষক, ল্যাব সুবিধা এবং আধুনিক সরঞ্জাম এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত।

কারিগরি শিক্ষার প্রসারে সরকারের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। যদিও গত এক দশকে এই হার প্রায় ১৪% থেকে বেড়ে ১৭%-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এটি এখনো অনেক কম। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে স্বয়ংক্রিয়করণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিংয়ের কারণে কিছু প্রচলিত চাকরির ক্ষেত্র বিলুপ্ত হয়ে নতুন নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে, এমনকি কারিগরি ডিগ্রিধারীরাও বেকারত্বের শিকার হতে পারেন। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, ২০১৯-এর অধীনে NSDA দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণকে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী ঢেলে সাজানোর কথা বললেও, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধীর এবং সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে। অনেক কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনও ডিজিটাল লিটারেসি, সফট স্কিলস এবং সমস্যা সমাধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলিতে জোর দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা বর্তমান চাকরির বাজারে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র তাত্ত্বিক জ্ঞান নিয়েই বের হচ্ছে, যা তাদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক কর্মবাজারে টিকে থাকা কঠিন করে তুলছে।

সূচক ২০১৬-১৭ ২০১৯-২০ ২০২২-২৩ (প্রাক্কলিত)
কারিগরি শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী ১২,৭৫,৩৫০ ১৬,৫০,২০০ ২০,১৫,৫০০
মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে কারিগরি শিক্ষার হার ১৪.২% ১৫.৮% ১৭.১%
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েট ১,১০,০০০ ১,৩০,০০০ ১,৬০,০০০
কর্মসংস্থান প্রাপ্তির হার (ডিপ্লোমা) ৫০% ৫২% ৪৮%
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সম্পর্কিত কোর্স চালু (সংখ্যা) ৫ ১২ ২৫

উৎস: BANBEIS, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, NSDA (বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত)

সুপারিশ

  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে একটি 'চতুর্থ শিল্প বিপ্লব কারিকুলাম রিভিউ বোর্ড' গঠন করতে হবে, যা প্রতি দুই বছর অন্তর দেশের শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী সকল কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কারিকুলাম আধুনিকীকরণ করবে এবং 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, ২০১৯' এর আলোকে অত্যাধুনিক ল্যাব ও প্রশিক্ষক নিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরি করবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে 'কারিগরি শিক্ষা আইন, ২০১৮' এর আওতায় একটি 'ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া পার্টনারশিপ ফান্ড' গঠন করতে হবে, যার মাধ্যমে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক শিল্প-সংযুক্তি ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম চালু করবে, যেখানে সফল ইন্টার্নদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সংশ্লিষ্ট কোর্স (যেমন: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি) প্রবর্তনের জন্য 'উচ্চশিক্ষা আইন, ২০১৭' এর আওতায় বিশেষ অনুদান বরাদ্দ দিতে হবে এবং এই কোর্সগুলোর জন্য উচ্চমানের শিক্ষক ও গবেষক নিয়োগের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে, যাতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় উচ্চতর গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator