এলএনজি আমদানিতে ডলার সংকট: ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে বিদ্যুৎখাত | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এলএনজি আমদানিতে ডলার সংকট: ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে বিদ্যুৎখাত

আনিসুর রহমান  avatar   
আনিসুর রহমান
এলএনজি আমদানিতে ডলার সংকট: ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে বিদ্যুৎখাত
এলএনজি আমদানিতে ডলার সংকট: ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে বিদ্যুৎখাত
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: আনিসুর রহমান | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: আনিসুর রহমান | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ)

সম্প্রতি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি জরুরি চিঠি পাঠিয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দাবি করেছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এলএনজি আমদানির উচ্চ ব্যয় এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের ভর্তুকির দাবি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান ডলার সংকট এবং অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ফাঁদকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্য এবং দেশীয় গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে এলএনজি নির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়ায়, জ্বালানি আমদানি বিল পরিশোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ডলারের সরবরাহ কমে যাওয়ায়, এলএনজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা সময়মতো বিল পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত করছে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট, যেখানে গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট এবং শীতকালে তা আরও কমে আসে প্রায় ১০-১২ হাজার মেগাওয়াটে। এই উদ্বৃত্ত সক্ষমতার একটি বড় অংশ আসে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে, যাদের সাথে সরকার 'নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট' চুক্তির পরিবর্তে 'ক্যাপাসিটি পেমেন্ট' চুক্তিতে আবদ্ধ। এর অর্থ হলো, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদন করুক বা না করুক, তাদের নির্দিষ্ট হারে ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতেই হবে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ পিডিবিকে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাতের ব্যয়ের একটি বিশাল অংশ। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ পরিশোধের চাপ এমন এক সময় আসছে যখন ডলারের অভাবে এলএনজি আমদানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, ফলে অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির অভাবে বন্ধ থাকছে। এই পরিস্থিতি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে এবং সরকারের ভর্তুকির বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপর মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী বছরগুলোতেও এলএনজির দাম স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা কম, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের এই ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাতের টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এলএনজি আমদানিতে ডলার সংকটের মূল কারণ হলো বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। রপ্তানি আয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি না হওয়া এবং আমদানি ব্যয়, বিশেষ করে জ্বালানি ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ, যা আমদানি ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পেট্রোবাংলা, এলএনজি আমদানির প্রধান সরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির জন্য বিল পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে, যার ফলে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে, যেখানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছে না। ফলস্বরূপ, বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে এবং লোডশেডিং বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শিল্প উৎপাদন এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের এক মূল্যায়ন রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান কাঠামো, যেখানে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের উচ্চ হার বিদ্যমান, তা বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচকে অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত জাতীয় বাজেট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উপরন্তু, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি আমদানিতেও একই ধরনের ডলার সংকট দেখা যাচ্ছে, যা দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলছে। মাতারবাড়ি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাতে পারছে না শুধুমাত্র জ্বালানি আমদানিতে ডলারের অভাবে।

অর্থবছর বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (মেগাওয়াট) সর্বোচ্চ চাহিদা (মেগাওয়াট) ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ (কোটি টাকা) এলএনজি আমদানি ব্যয় (বিলিয়ন ডলার)
২০২১-২২ ২২,৭৮৭ ১৪,৭৮২ ২১,৮০০ ৫.২
২০২২-২৩ ২৪,৯৪২ ১৫,৪০০ ২৬,০০০ ৭.১
২০২৩-২৪ (প্রক্ষেপিত) ২৮,০০০ ১৬,৫০০ ৩০,০০০ ৮.৫

উৎস: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), বাংলাদেশ ব্যাংক, পেট্রোবাংলা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়।

সুপারিশ

  • বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে দ্রুত বিদ্যমান বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সম্পাদিত ক্যাপাসিটি পেমেন্ট চুক্তির শর্তাবলী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে 'নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট' মডেলের দিকে পর্যায়ক্রমে স্থানান্তরের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, বিশেষ করে যেসব কেন্দ্রের উৎপাদন খরচ অত্যাধিক বা যাদের সক্ষমতা দীর্ঘকাল ধরে অব্যবহৃত রয়েছে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে সমন্বিতভাবে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করতে হবে, পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং এলএনজি আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদী, সুরক্ষিত অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (যেমন World Bank, ADB) থেকে স্বল্প সুদে ঋণ গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে।
  • পেট্রোবাংলাকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ) প্রকল্পে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা যায় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আনিসুর রহমান

আনিসুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator