প্রযুক্তির মায়াজাল: তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যে ডিজিটাল আসক্তির প্রভাব | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্রযুক্তির মায়াজাল: তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যে ডিজিটাল আসক্তির প্রভাব

নাসরিন আক্তার  avatar   
নাসরিন আক্তার
প্রযুক্তির মায়াজাল: তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যে ডিজিটাল আসক্তির প্রভাব
প্রযুক্তির মায়াজাল: তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যে ডিজিটাল আসক্তির প্রভাব
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: নাসরিন আক্তার | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: নাসরিন আক্তার | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস)

সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮-২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে প্রায় ৩০% ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের কারণে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং নিদ্রাহীনতার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। এই গবেষণার ফলাফল আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে, যখন স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা তাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর পরবর্তী সময়ে অনলাইনে ক্লাস এবং সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্মগুলির ব্যাপক ব্যবহার এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো এখনো এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত নয়।

ডিজিটাল আসক্তি কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অনলাইন গেমিং, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহারের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায়। ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ হেলথ সার্ভিসেস (DGHS) এর একটি অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা অনুসারে, বিগত তিন বছরে অনলাইন গেমিং আসক্তির কারণে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং চাওয়া তরুণদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই আসক্তি তরুণদের শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তাদের সামাজিক মেলামেশা কমিয়ে দিচ্ছে এবং পারিবারিক সম্পর্কগুলিতেও টানাপোড়েন সৃষ্টি করছে। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে, যা তাদের উচ্চশিক্ষার পথকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্বের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, চোখের সমস্যা, ঘাড় ও পিঠের ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতাও ডিজিটাল আসক্তির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এর সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে NIMH-এর সীমিত জনবল এবং অবকাঠামো দিয়ে এই ব্যাপক সমস্যা মোকাবিলা করা কঠিন। ২০১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য আইন কার্যকর থাকলেও, ডিজিটাল আসক্তিকে একটি সুনির্দিষ্ট মানসিক ব্যাধি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এর প্রতিকারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে, ডিজিটাল আসক্তির প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ এবং হস্তক্ষেপের জন্য স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানী ও কাউন্সিলরের অভাব প্রকট। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)-এর তত্ত্বাবধানে আসক্তি নিরাময়ের জন্য নির্দিষ্ট ঔষধের সহজলভ্যতা এবং এ সংক্রান্ত গবেষণা ও উন্নয়নও সীমিত, যা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ডিজিটাল আসক্তির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব মোকাবিলায় একটি বড় বাধা।

মানসিক স্বাস্থ্যের দিক ২০২০ সালের হিসাব (%) ২০২৩ সালের হিসাব (%) পরিবর্তন (%)
ডিজিটাল আসক্তিজনিত উদ্বেগ ১২.৫ ২৪.২ +১১.৭
ডিজিটাল আসক্তিজনিত বিষণ্ণতা ১০.৮ ২১.০ +১০.২
ডিজিটাল আসক্তিজনিত নিদ্রাহীনতা ৮.১ ১৫.৫ +৭.৪
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ৯.৩ ১৮.০ +৮.৭
শিক্ষায় অমনোযোগিতা ৭.০ ১৩.৮ +৬.৮

উৎস: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ হেলথ সার্ভিসেস (DGHS) এর যৌথ সমীক্ষা, ২০২৩

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৯ এর আওতায় একটি সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করুক, যেখানে ডিজিটাল আসক্তিকে একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এর প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসার জন্য বিশেষ তহবিল বরাদ্দ ও কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই নীতিতে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং এবং সচেতনতা কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করা হোক।
  • ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ হেলথ সার্ভিসেস (DGHS) এর অধীনে প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ডিজিটাল আসক্তি নিরাময়ের জন্য বিশেষায়িত কাউন্সেলিং ইউনিট স্থাপন করা হোক এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর মাধ্যমে পর্যাপ্ত সংখ্যক মনোবিজ্ঞানী ও থেরাপিস্টকে এই বিষয়ে প্রশিক্ষিত করা হোক। IEDCR কে এই ইউনিটের কার্যকারিতা এবং ডিজিটাল আসক্তির প্রবণতা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও ডেটা সংগ্রহে দায়িত্ব দেওয়া হোক।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ঔষধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করুক এবং ডিজিটাল আসক্তি মোকাবিলায় নতুন থেরাপিউটিক অ্যাপ্রোচ ও ঔষধের গবেষণায় উৎসাহিত করুক। একই সাথে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এমন নীতিমালা তৈরি করা হোক, যা ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল স্বাস্থ্যের প্রতি সংবেদনশীল এবং আসক্তি প্রতিরোধক ফিচার অন্তর্ভুক্ত করে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন আক্তার

নাসরিন আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

コメントがありません


News Card Generator