রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংকট: আন্তর্জাতিক উদাসীনতার মুখে বাংলাদেশের কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংকট: আন্তর্জাতিক উদাসীনতার মুখে বাংলাদেশের কৌশল

রাসেল মাহমুদ  avatar   
রাসেল মাহমুদ
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংকট: আন্তর্জাতিক উদাসীনতার মুখে বাংলাদেশের কৌশল
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংকট: আন্তর্জাতিক উদাসীনতার মুখে বাংলাদেশের কৌশল
ছবি: সংগৃহীত
কলামিস্ট: রাসেল মাহমুদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: বৈশ্বিক অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট)
📰 বিশেষ মতামত ও কলাম

কলামিস্ট: রাসেল মাহমুদ | জ্যেষ্ঠ বিষয়ভিত্তিক গবেষক (খাত: বৈশ্বিক অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট)

সম্প্রতি, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃশ্যমান উদাসীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ব্যর্থতা এবং আসিয়ান দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার অভাবের দিকে ইঙ্গিত করে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে যে, দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় দুলছে। এই বিবৃতিতে, বিশেষত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যেখানে তাদের ম্যান্ডেট থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বাংলাদেশের এই অবস্থান বৈশ্বিক শরণার্থী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার ফাটল এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক জটিলতার এক নতুন মাত্রাকে তুলে ধরেছে।

এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশের কৌশল বহুমাত্রিক হলেও, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফলপ্রসূ সমর্থন আদায়ে তা বারবার হোঁচট খাচ্ছে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় মিয়ানমারের অনীহা এবং চীনের মধ্যস্থতায় প্রত্যাবাসনের সীমিত উদ্যোগগুলোও সফলতার মুখ দেখেনি। ২০১৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সাথে একাধিকবার প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষর করলেও, মিয়ানমার সরকারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পালনে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ফলস্বরূপ, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে ভয় পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও তাদের জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনে রাজি নয়। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ সরকার আঞ্চলিক জোট যেমন BIMSTEC এবং সার্ক-এর মঞ্চ ব্যবহার করে সদস্য দেশগুলোর উপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছে, কিন্তু এই সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভেদ এবং মিয়ানমারের উপর সরাসরি প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতার অভাবে সেই প্রচেষ্টাগুলোও খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, BIMSTEC-এর মন্ত্রী পর্যায়ের সভাগুলোতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হলেও, মিয়ানমারকে কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণে বাধ্য করা যায়নি, যা এই জোটের সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা মূলত মানবিক সাহায্য ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের উপর জোর দিয়েছে। বাংলাদেশ UN Peacekeeping মিশনে অন্যতম বৃহৎ সৈন্য সরবরাহকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব হতাশাজনক। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর প্রস্তাব বা পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। উপরন্তু, মিয়ানমারের প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক অংশীদারদের নীরব সমর্থন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম, যেমন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, মানবাধিকার কাউন্সিল এবং ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (OIC)-তে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি নিয়মিত উত্থাপন করেছে, যেখানে তারা মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। তবে, এই আহ্বানগুলো প্রায়শই প্রতীকী সমর্থনের বাইরে বাস্তব কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, যা বাংলাদেশের জন্য এই বিশাল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর বোঝা বহন করা আরও কঠিন করে তুলেছে।

বিষয় ২০১৭ ২০১৮ ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (নভেম্বর পর্যন্ত)
বাংলাদেশে আশ্রয়প্রাপ্ত রোহিঙ্গার সংখ্যা (আনুমানিক) ৭,০০,০০০ ১১,০০,০০০ ১১,১০,০০০ ১১,১৮,০০০ ১১,২৯,০০০ ১১,৬৪,০০০ ১১,৮০,০০০
প্রত্যাবাসনের চেষ্টা (দ্বিপাক্ষিক) ০ ০ ২ (ব্যর্থ) ০ ০ ০ ১ (সীমিত, পরীক্ষামূলক, ব্যর্থ)
UNHCR-এর প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নেই নেই প্রস্তাবিত নেই নেই নেই সীমিত, শর্তাধীন
আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা (বিলিয়ন ডলারে) ০.৪ ০.৮ ০.৯ ০.৭ ০.৬ ০.৫ ০.৪ (প্রক্ষেপিত)

উৎস: বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, UNHCR, IOM এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে আলাদাভাবে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার সাথে, যেন তারা মিয়ানমারের উপর কার্যকর চাপ সৃষ্টিতে সম্মত হয় এবং মিয়ানমারের উপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো প্রস্তাব উত্থাপন করে।
  • BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোকে কেবলমাত্র আলোচনা ফোরাম হিসেবে না রেখে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে একটি সুনির্দিষ্ট আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে বাধ্য করতে হবে, যার মধ্যে মিয়ানমারের উপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুস্পষ্ট ধারা অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং এর বাস্তবায়নে BIMSTEC সচিবালয়কে পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্ট পেশের ক্ষমতা দিতে হবে।
  • UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের বৃহৎ অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাদেশ সরকারকে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জোরালোভাবে দাবি জানাতে হবে যে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবাসনের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে UN Peacekeeping ফোর্স মোতায়েনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হোক, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেট অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রাসেল মাহমুদ

রাসেল মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বৈশ্বিক অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator