মুখে ফুল, পর্দায় ফাঁক | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মুখে ফুল, পর্দায় ফাঁক

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
মুখে ফুল, পর্দায় ফাঁক
মুখে ফুল, পর্দায় ফাঁক
ছবি: সংগৃহীত
ফেসবুকের স্টিকার-সংস্কৃতি ও আমাদের দ্বৈত মানসিকতা:
- সালাউদ্দিন আকবর , ঢাকা..

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক অদ্ভুত দৃশ্য এখন প্রায়ই চোখে পড়ে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে হাসিমুখের একটি ছবি। স্বামী আছেন, সন্তান আছে, আত্মীয়স্বজনও আছে। শুধু একজনের মুখে বসানো হয়েছে একটি ফুল, কখনও ডাব, কখনও হৃদয়চিহ্ন, আবার কখনও এমন কোনো স্টিকার যা দেখে মনে হয় ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকেই আড়াল করার চেষ্টা চলছে।

সম্প্রতি এক বন্ধুর সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। প্রশ্ন করেছিলাম, "তোমার স্ত্রীর ছবি কখনও দাও না কেন?" উত্তরে সে বলল, "আমার স্ত্রী পর্দা করেন। তাই ছবি আপলোড করি না।"

কথাটি শুনে সম্মানই জন্মেছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর মনে পড়ল, মাঝেমধ্যে তো তার পরিবারসহ ছবি দেখি। সেখানে স্ত্রীর মুখে একটি ফুল বা অন্য কোনো স্টিকার লাগানো থাকে। তখন প্রশ্ন জাগল, যদি পর্দার কারণেই ছবি না দেওয়া হয়, তবে শরীরের অবয়ব, পোশাক, উপস্থিতি সবই যখন দৃশ্যমান, শুধু মুখটুকু ঢেকে রাখার এই সংস্কৃতির অর্থ কী?

এ প্রশ্ন ধর্মীয় বিতর্কের নয়, বরং যুক্তি ও মর্যাদার প্রশ্ন।

যারা সত্যিকার অর্থে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে চান, তারা সাধারণত ছবি প্রকাশই করেন না। সেটি একটি স্পষ্ট অবস্থান। কিন্তু পুরো পরিবারের ছবি প্রকাশ করে একজন মানুষের মুখে কৃত্রিমভাবে ফলমূল বা কার্টুন বসিয়ে দেওয়া অনেক সময় এমন একটি বার্তা দেয়, যেন ছবির সেই মানুষটির নিজস্ব পরিচয়, ব্যক্তিত্ব বা অস্তিত্ব গৌণ।

বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে যখন সেই ব্যক্তি একজন নারী। কারণ ছবিটি দেখার পর দর্শকের প্রথম দৃষ্টি যায় সেই আড়াল করা মুখটির দিকে। তখন উদ্দেশ্য যদি হয় গোপন রাখা, ফল হয় উল্টো। আড়ালই হয়ে ওঠে সবচেয়ে দৃশ্যমান বিষয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই স্টিকার-সংস্কৃতি এক ধরনের দ্বৈত মানসিকতারও প্রতিফলন। একদিকে আমরা নিজেদের ধর্মীয় বা সামাজিক মূল্যবোধের পরিচয় দিতে চাই, অন্যদিকে পারিবারিক ছবি প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষাও ছাড়তে পারি না। ফলে জন্ম নেয় এক মধ্যবর্তী অবস্থান, যেখানে না পুরোপুরি গোপনীয়তা রক্ষা হয়, না প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতা থাকে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। স্ত্রীর মুখে ফুল বসানোর সিদ্ধান্তটি কার? অনেক ক্ষেত্রে নারীর নিজের ইচ্ছা নয়, বরং স্বামীর সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পায়। তখন বিষয়টি কেবল পর্দা নয়, প্রতিনিধিত্ব ও সম্মানের প্রশ্নেও রূপ নেয়।

পর্দা একটি ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় অনুশীলন। এটি শ্রদ্ধার বিষয়। কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যদি সামাজিক মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপিত হয়, যাতে একজন মানুষকে তার স্বাভাবিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল একটি স্টিকারে পরিণত করা হয়, তাহলে সেখানে ভাবনার অবকাশ থেকেই যায়।

হয়তো সময় এসেছে নিজেদের কাছে একটি সহজ প্রশ্ন করার। যদি সত্যিই গোপন রাখতে চাই, তবে সম্পূর্ণ গোপন রাখি। আর যদি প্রকাশ করি, তবে সম্মান ও স্বাভাবিকতার সঙ্গে করি। কারণ মুখে ফুল বসিয়ে মানুষকে আড়াল করা যায়, কিন্তু দ্বিধা ও দ্বৈততার প্রশ্নকে আড়াল করা যায় না।

পর্দার সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে বিশ্বাসে, স্টিকারে নয়। আর সম্মান লুকিয়ে আছে মর্যাদায়, মুখ মুছে দেওয়ায় নয়।

লেখক ও কলামিস্ট 

(মতামতধর্মী ফিচার)

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator