জল যখন সতর্কবার্তা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জল যখন সতর্কবার্তা

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
জল যখন সতর্কবার্তা
জল যখন সতর্কবার্তা
ছবি: সংগৃহীত
খরা, বন্যা ও তাপপ্রবাহের যুগে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা কেন অস্তিত্বের শর্ত।

সালাউদ্দিন আকবর, ঢাকা 

একসময় নদী ছিল সভ্যতার জন্মদাত্রী। আজ সেই নদীই কোথাও শুকিয়ে ফেটে যাওয়া মাটির দীর্ঘশ্বাস, কোথাও আবার উন্মত্ত স্রোতের ধ্বংসযজ্ঞ। প্রকৃতির এই দ্বৈত রূপ আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য উন্মোচন করছে—পানির সংকট আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা।

বিশ্বের বহু দেশ আজ একই সঙ্গে খরা ও বন্যার অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। এক ঋতুতে পানির জন্য হাহাকার, আরেক ঋতুতে অতিরিক্ত পানির আঘাতে জনপদ ভাসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে প্রকৃতির চিরচেনা ছন্দ ভেঙে পড়ছে। ফলে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা আর উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি খাতমাত্র নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকা, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত হয়ে উঠেছে।

যখন আকাশের ক্যালেন্ডার বদলে যায়

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও আজ পানির প্রাচুর্য মানেই নিরাপত্তা নয়। বর্ষায় অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং নদীভাঙন যেমন বাড়ছে, তেমনি শুষ্ক মৌসুমে নদী ও খালগুলো হারাচ্ছে তাদের প্রাণ। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে উদ্বেগজনক হারে।

আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এখন কৃষকের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। আগে যে বৃষ্টিপাতের সময়সূচি মোটামুটি নির্ভরযোগ্য ছিল, এখন তা হয়ে উঠেছে অনিশ্চিত। কখনো প্রয়োজনের সময় বৃষ্টি নেই, আবার কখনো অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হয়ে সৃষ্টি করছে জলাবদ্ধতা ও ফসলহানি।

এই পরিবর্তন কেবল কৃষির সমস্যা নয়; এটি খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা একই বছরে দেখা গেছে। একদিকে কৃষক সেচের পানির জন্য হাহাকার করছেন, অন্যদিকে অতিবৃষ্টিতে ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে, পানিসমস্যাকে আর একক কোনো দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন একটি সমন্বিত জাতীয় সংকট।

পানির সংকট মানেই শুধু পানির অভাব নয়

অনেকে মনে করেন, পানির সংকট মানে কল খুললে পানি না আসা। বাস্তবে বিষয়টি অনেক গভীর।পানির সংকট মানে নিরাপদ পানীয় জলের অভাব, কৃষিকাজে সেচের ঘাটতি, শিল্প উৎপাদনে বাধা, জলজ জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি।

যেখানে বিশুদ্ধ পানি নেই, সেখানে ডায়রিয়া, কলেরা ও নানা জলবাহিত রোগের বিস্তার ঘটে। যেখানে পর্যাপ্ত পানি নেই, সেখানে খাদ্য উৎপাদন কমে যায়। আর যেখানে পানি দূষিত, সেখানে পুরো বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অর্থাৎ পানি শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

খাল-বিল হারানোর মূল্য

একসময় বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে ছিল খাল, বিল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক জলাধারের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। এগুলো বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধারণ করত এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহে সহায়তা করত।

কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল এবং ভরাটের ফলে হাজার হাজার খাল ও জলাশয় বিলুপ্ত হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের স্বাভাবিক ব্যবস্থা নষ্ট হয়েছে।

আজ শহরে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট তীব্র হয়। প্রকৃতপক্ষে আমরা নিজেদের প্রাকৃতিক জলভাণ্ডার নিজেরাই ধ্বংস করেছি।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাল পুনঃখনন কর্মসূচি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে শুরু করে মধ্যাঞ্চলের বহু এলাকায় মৃতপ্রায় খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের ফলে কোথাও জলাবদ্ধতা কমেছে, কোথাও কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বেড়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, কেবল খনন করলেই হবে না; দখলমুক্ত রাখা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে খালকে জীবন্ত রাখতে হবে। অন্যথায় কয়েক বছরের মধ্যেই পুনঃখনন করা খাল আবারও পলি ও দখলের কবলে পড়ে যাবে।

ভূগর্ভস্থ পানির নীরব আর্তনাদ

বাংলাদেশে পানির চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। কৃষি, শিল্প ও গৃহস্থালি ব্যবহারে প্রতিনিয়ত গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ যে হারে হওয়ার কথা, উত্তোলন হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি।

ফলে অনেক এলাকায় পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও নলকূপে আগের মতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। উপকূলীয় অঞ্চলে আবার লবণাক্ততার বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এ যেন মাটির নিচে জমা থাকা হাজার বছরের সঞ্চয় আমরা কয়েক দশকেই শেষ করে ফেলছি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু যে হারে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, সে তুলনায় প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ হচ্ছে না। এর ফলে ভবিষ্যতে পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এটি শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; বরং নগর ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।

শহর যখন বৃষ্টির কাছে পরাজিত

একসময় বৃষ্টির পানি দ্রুত নদী, খাল ও জলাশয়ে প্রবাহিত হতো। কিন্তু নগরায়ণের চাপে সেই স্বাভাবিক প্রবাহপথের অনেকটাই হারিয়ে গেছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে মাঝারি বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এটি কেবল নাগরিক দুর্ভোগ নয়; অর্থনৈতিক ক্ষতি, যানজট, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাসেরও কারণ। প্রকৃতপক্ষে নগর জলাবদ্ধতা আমাদের অপরিকল্পিত উন্নয়ন মডেলের একটি দৃশ্যমান প্রতীক।

তাপপ্রবাহের অদৃশ্য অভিঘাত

তাপপ্রবাহ শুধু মানুষের অস্বস্তি বাড়ায় না; এটি পানির ওপরও ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করে।তাপমাত্রা বাড়লে বাষ্পীভবন বৃদ্ধি পায়। নদী, পুকুর ও জলাশয়ের পানি দ্রুত কমে যায়। কৃষিক্ষেত্রে সেচের প্রয়োজন বাড়ে। একই সময়ে পানীয় জলের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়।

ফলে একদিকে সরবরাহ কমে, অন্যদিকে চাহিদা বাড়ে। এই দ্বৈত চাপ পানির সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটবে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন। তাই এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা: ভবিষ্যতের বেঁচে থাকার কৌশল

আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, আমরা পানিকে এখনও সীমাহীন সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করি। উন্নয়ন পরিকল্পনায় রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও পানি ব্যবস্থাপনাকে প্রায়ই সহায়ক খাত হিসেবে দেখা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, পানি ছাড়া কৃষি, শিল্প, নগরায়ণ কিংবা জনস্বাস্থ্যের কোনো ভিত্তিই টেকসই হতে পারে না। তাই পানি ব্যবস্থাপনাকে পরিবেশ মন্ত্রণালয় বা পানি উন্নয়ন বোর্ডের একক দায়িত্ব হিসেবে দেখার সময় শেষ। এটি জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান পাওয়ার দাবি রাখে।

টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা বলতে এমন ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে বর্তমানের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও পানি সম্পদ সংরক্ষণ করা হয়।

এ জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণকে জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। নগর ও গ্রাম উভয় এলাকাতেই রেইনওয়াটার হারভেস্টিং বা বৃষ্টির পানি সংগ্রহের উদ্যোগ বাড়াতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নদী, খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার করতে হবে। প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষা ছাড়া পানি সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, কৃষিতে পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আধুনিক সেচব্যবস্থা পানি অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

চতুর্থত, শিল্পকারখানায় পানির পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবহৃত পানি পরিশোধন করে পুনরায় ব্যবহার করলে বিপুল পরিমাণ পানি সাশ্রয় সম্ভব।

পঞ্চমত, পানি দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। কারণ দূষিত পানি কার্যত ব্যবহার অযোগ্য সম্পদে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিকেরও দায়িত্ব

পানি ব্যবস্থাপনা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস বড় পরিবর্তন আনতে পারে। অপ্রয়োজনীয় পানি ব্যবহার কমানো, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাশয় দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং গাছ লাগানোর মতো উদ্যোগ পানি সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাতে নয়, সহাবস্থানে বিশ্বাস করতে হবে। কারণ পানি প্রকৃতির দান, মানুষের সৃষ্টি নয়।

বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন পানির প্রাপ্যতা নয়, বরং পানির সুশাসন। নদীমাতৃক একটি দেশে যদি মানুষ নিরাপদ পানির জন্য উদ্বিগ্ন হয়, তাহলে সংকট প্রকৃতির চেয়ে ব্যবস্থাপনার মধ্যেই বেশি। নদী, খাল, জলাভূমি এবং ভূগর্ভস্থ পানিকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা না করলে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।

শেষকথা: আগামী দিনের যুদ্ধ হতে পারে পানির জন্য

একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়তো আর তেল বা স্বর্ণ হবে না; হবে নিরাপদ পানি।

যে পৃথিবীতে একই সঙ্গে খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ ও পানির সংকট বাড়ছে, সেখানে পানি ব্যবস্থাপনা শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানব সভ্যতার টিকে থাকার প্রশ্ন।

আজ যদি আমরা নদী বাঁচাতে না পারি, খাল ফিরিয়ে আনতে না পারি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ না করি এবং পানির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ না শিখি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

কারণ সভ্যতার ইতিহাসে বহু যুদ্ধ হয়েছে ভূমির জন্য, সম্পদের জন্য, ক্ষমতার জন্য। কিন্তু সামনে হয়তো এমন এক সময় অপেক্ষা করছে, যখন মানুষের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম হবে এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানির জন্য।

সেই ভবিষ্যৎ এড়ানোর একমাত্র পথ হলো আজই টেকসই পানি ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করা। কেননা পানি শুধু একটি সম্পদ নয়, পানি হলো জীবনের অন্য নাম; আর জীবন রক্ষার প্রশ্নে কোনো বিকল্প নেই।

 

লেখক ও প্রাবন্ধিক। 

 

 

Nessun commento trovato


News Card Generator