মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) গ্র্যাজুয়েশন নাইটে শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার জোয়ারে ভেসেছেন শিক্ষা ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। রাষ্ট্র ও ছাত্রদের এই অভাবনীয় সান্নিধ্য, দূরত্ব ঘুচিয়ে ফেলার এই মেলবন্ধন নিঃসন্দেহে এক অভিনব নজির এবং প্রশংসার দাবীদার। একজন শীর্ষ অভিভাবকের এমন সহজলভ্যতা নতুন বাংলাদেশের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
তবে এই আনন্দ-উল্লাসের মোহময় আলোর ঠিক পেছনেই লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার বাস্তব। আলোর নিচে অন্ধকারের মতোই ধিকিধিকি জ্বলছে দেশের লাখো অভিভাবকের ক্ষোভ, হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস। উৎসবের এই চাদর সরিয়ে এখন সময় এসেছে শিক্ষাঙ্গনের ভেতরের ক্ষতগুলোকে অবলোকন করার।
রাজনীতিমুক্ত প্রাঙ্গণ ও নিশ্ছিদ্র নজরদারির তাগিদ
শিক্ষার পবিত্র আঙিনাকে দলীয় রাজনীতির নোংরা সমীকরণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শুধু আনুষ্ঠানিক নয়, বরং কার্যকর ও নিশ্ছিদ্র নজরদারি বাড়াতে হবে। ক্ষমতার পালাবদল যেন নতুন কোনো সিন্ডিকেটের জন্ম না দেয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিভাবকদের সরাসরি সংযোগ: চাই 'শিক্ষা হটলাইন'
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যকার আমলাতান্ত্রিক দেয়াল ভাঙতে একটি সার্বক্ষণিক ‘অভিভাবক অভিযোগ হটলাইন’ চালু করা এখন যুগের দাবি। যেখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা ভয়ের পরিবেশ ছাড়াই অভিভাবকেরা সরাসরি তাদের সন্তানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরতে পারবেন। এই ডিজিটাল সেতুটি তৈরি হলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষে তৃণমূলের প্রকৃত চিত্র পাওয়া সহজ হবে।
তৃতীয় শ্রেণী থেকেই কোচিংয়ের থাবা: শিক্ষকের আড়ালে ব্যবসায়ী?
সবচেয়ে বড় অ্যালার্ম বাজছে প্রাথমিক শিক্ষায়। মাত্র তৃতীয় শ্রেণীর একজন কোমলমতি শিক্ষার্থীকে যখন খেলার মাঠ ছেড়ে কোচিংয়ের অন্ধকার চার দেয়ালে বন্দি হতে হয়, তখন বুঝতে হবে শিক্ষাব্যবস্থা ভেতর থেকে পচে গেছে। একশ্রেণীর শ্রেণী শিক্ষক ক্লাসে পাঠদানে উদাসীন থেকে শিক্ষার্থীদের নিজের প্রাইভেট ব্যাচে বা নির্দিষ্ট কোচিংয়ে যেতে বাধ্য করছেন—এমন ‘জোর প্রচেষ্টা’ এখন ওপেন সিক্রেট। এই অন্তরাল বা পর্দার পেছনের বাণিজ্য বন্ধ না হলে মেধার বিকাশ থমকে যাবে। শিক্ষকের মহান ব্রত যখন বাণিজ্যের খেরোখাতায় রূপ নেয়, তখন তা পুরো জাতির জন্য অশনিসংকেত ডেকে আনে।
গ্র্যাজুয়েটদের কাঁধে চড়ে আকাশে ওড়ার আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের একদম তৃণমূলের প্রতিটি শিশু গাইড বই আর কোচিংয়ের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে মুক্ত বাতাসে হাসতে পারবে। বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়তে তাই উৎসবের আমেজ কাটিয়ে অবিলম্বে এই কাঠামোগত সংস্কারে হাত দেওয়া জরুরি।