চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্য উত্তর বাড্ডা-রামপুরা-ভাটারা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্য উত্তর বাড্ডা-রামপুরা-ভাটারা

Akib Hasan Shad avatar   
Akib Hasan Shad
চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্য উত্তর বাড্ডা-রামপুরা-ভাটারা
চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্য উত্তর বাড্ডা-রামপুরা-ভাটারা
ছবি: সংগৃহীত
অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী চক্রের দখলে রাজধানীর পূর্বাঞ্চল; নতুনবাজার, শাহজাদপুর ও বাড্ডা জুড়ে ভয়, চাঁদা ও দখলের সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা..

বিশেষ অনুসন্ধান | পর্ব : ১

 

রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা—উত্তর বাড্ডা, রামপুরা, শাহজাদপুর, নতুনবাজার ও ভাটারা—দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী চক্রের তৎপরতার অভিযোগে আলোচিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক তালিকা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বলছে, ঢাকার চাঁদাবাজি অর্থনীতির অন্যতম শক্ত ঘাঁটি এখন এই করিডর।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তালিকায় রাজধানীতে সক্রিয় ১,২৮০ জন চাঁদাবাজের মধ্যে ১৪৮ জনকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর একটি বড় অংশের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু গড়ে উঠেছে গুলশান-বাড্ডা-ভাটারা-রামপুরা অঞ্চলকে ঘিরে।

 

• উত্তর বাড্ডা: ভয় ও চাঁদার অদৃশ্য সাম্রাজ্য :

স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, উত্তর বাড্ডার বিভিন্ন বাজার, গ্যারেজ, ঝুট ব্যবসা, নির্মাণকাজ এবং ফুটপাতকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রবিন-ডালিম-মাহবুব গ্রুপ, কলিং মেহেদী গ্রুপ এবং জিসান গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযুক্ত বিভিন্ন সদস্য এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয়ভাবে অনেক ব্যবসায়ী প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না; কারণ অভিযোগ করলে হামলা, ভয়ভীতি কিংবা ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

 

• শাহজাদপুর; ফুটপাত থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—সবখানেই অভিযোগ :

শাহজাদপুর এলাকায় ফুটপাতের দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, গুলশান-১, গুলশান-২ ও শাহজাদপুর এলাকায় বিভিন্ন দোকান থেকে দৈনিক ভিত্তিতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রে চাঁদা আদায়কে এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে যে নতুন ব্যবসা শুরু করলেও প্রথমেই ‘লাইন খরচ’ বা ‘নিরাপত্তা খরচ’ নামে অর্থ দাবি করা হয়।

 

• নতুনবাজার; দ্রুত নগরায়ণের আড়ালে অপরাধ অর্থনীতির বিস্তার :

নতুনবাজার ও আশপাশের এলাকায় গত এক দশকে ব্যাপক নগরায়ণ হয়েছে। বহুতল ভবন, আবাসিক প্রকল্প, বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং নতুন বিনিয়োগের কারণে এলাকায় বিপুল অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই উন্নয়নকে ঘিরে গড়ে উঠেছে চাঁদাবাজির নতুন ক্ষেত্র। নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ, শ্রমিক নিয়ন্ত্রণ, ট্রাক প্রবেশ, জমি উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সেবা খাতকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কিছু ক্ষেত্রে চাঁদা না দিলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া, শ্রমিক সরিয়ে নেওয়া বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে।

 

• ভাটারা; রাজধানীর অন্যতম স্পর্শকাতর অপরাধ অঞ্চল :

ভাটারা এলাকায় ব্যবসায়ী ও গাড়ি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা দাবির অভিযোগ বহুবার সামনে এসেছে।

বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের ভয় দেখানো হয়। কোথাও কোথাও ককটেল বিস্ফোরণ, হামলার হুমকি কিংবা সশস্ত্র মহড়া প্রদর্শনের মাধ্যমে আতঙ্ক তৈরির অভিযোগও রয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্যমতে, ভাটারা এলাকায় কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সক্রিয় রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য আছে।

 

• রামপুরা; অপরাধ করিডরের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল :

রামপুরা এখন শুধু আবাসিক এলাকা নয়; এটি বাড্ডা, বনশ্রী, মালিবাগ, মগবাজার ও গুলশান করিডরের সংযোগস্থল।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকা অনুযায়ী, রামপুরা ও আশপাশের এলাকায় জিসান গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযুক্ত একাধিক সদস্যের নাম রয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এলাকায় প্রভাব বিস্তার, চাঁদা আদায় এবং আধিপত্য রক্ষাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে।

 

• বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ :

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যমতে, আলোচিত কয়েকটি গ্রুপের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু ব্যক্তি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা বিদেশে অবস্থান করেও অনলাইন যোগাযোগ, মধ্যস্থতাকারী এবং স্থানীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

এই অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

 

• রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক বার্তা :

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনই সর্বোচ্চ শক্তি হওয়ার কথা। কিন্তু যখন কোনো এলাকায় ব্যবসায়ী, দোকানদার, পরিবহন শ্রমিক বা সাধারণ নাগরিকের মনে এই ধারণা জন্ম নেয় যে আইনের চেয়ে সন্ত্রাসী চক্র বেশি শক্তিশালী—তখন সেটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের জন্য অশনিসংকেত।

বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজি কেবল অর্থ আদায়ের অপরাধ নয়; এটি আইনের শাসন, বিনিয়োগ পরিবেশ, নাগরিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।

 

• শুধু গ্রেপ্তার নয়; প্রয়োজন পুরো নেটওয়ার্ক ধ্বংস :

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—গ্রেপ্তার কি কেবল মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই করতে হলে অস্ত্রধারী সদস্যদের পাশাপাশি অর্থদাতা, আশ্রয়দাতা, অবৈধ অস্ত্র সরবরাহকারী, প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক এবং বিদেশে বসে নির্দেশদাতা পুরো নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় আনতে হবে।

অন্যথায় গ্রেপ্তার হবে ব্যক্তি, পরিবর্তন হবে নেতৃত্ব, কিন্তু চাঁদাবাজির কাঠামো অক্ষত থেকে যাবে—আর উত্তর বাড্ডা, রামপুরা, শাহজাদপুর, নতুনবাজার ও ভাটারার সাধারণ মানুষকে বাঁচতে হবে ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই।

 

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator