আমাদের গ্রামে এক অদ্ভুত রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। রোগের নাম, “দেখে-শুনে ভুল বোঝা সিনড্রোম”।
যার মুখে দাড়ি, তাকে দেখলেই কেউ না কেউ ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, "ওই যে দুলাভাই আসতেছে!"
আমি বললাম, "আরে ভাই, মুখে দাড়ি দেখলেই মানুষ দুলাভাই হয় নাকি?"
গ্রামের প্রবীণ গবেষক কুদ্দুস চাচা চশমা নামিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
"এখনকার যুগে কিছুই বলা যায় না। তবে শুনছি, দুলাভাইও নাকি লম্বা চুলে ফিতা বাঁধে!"
এই কথা শোনার পর বাজারে তিনজন দাড়িওয়ালা যুবককে দেখা গেল নাপিতের দোকানে ছুটে যেতে। তারা ভেবেছে, দাড়ি রাখলেই যদি মানুষ ভুল করে দুলাভাই ভাবে, তবে চুলে ফিতা বাঁধলে হয়তো সরাসরি আত্মীয়স্বজনের তালিকায় নাম উঠে যাবে।
এর মধ্যেই সংসদে তুমুল আলোচনা চলাকালে এক সম্মানিত সংসদ সদস্য, হঠাৎ করেই দাড়ি-সংকট নিয়ে জাতিকে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়ে বসলেন।
তিনি টেবিলে হাত ঠুকে বললেন,
"মুখে দাড়ি দেখলে দুলাভাই মনে করার কোনো কারণ নাই!"
সংসদ কক্ষে মুহূর্তের জন্য নেমে এলো এক গভীর নীরবতা। কেউ বুঝতে পারছিলেন না, এটি পারিবারিক সম্পর্ক বিষয়ক বক্তব্য, নাকি জাতীয় পরিচয় সংকট নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার ফলাফল।
তবে গ্রামের কুদ্দুস চাচা বক্তব্যটি শুনে সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য করলেন,
"ঠিকই কইছে। কারণ বর্তমান বাজারদরে দাড়ির চেয়ে ফিতার দাম বেশি। এখন দুলাভাই চিনতে হইলে আগে চুলের দিকে তাকাইতে হবে!"
এর মধ্যেই দেশজুড়ে আরেক খবর বাতাসের ঘুড়ির মতো উড়তে শুরু করল।
সংসদে নাকি আলোচনা হচ্ছে, জেলায় জেলায় বিয়ের প্রস্তাবনা উৎসাহিত করা যায় কি না!
খবরটা সত্যি কি মিথ্যা, তা কেউ জানে না। কিন্তু গুজবেরও তো পাখা থাকে।
আমাদের চাচা সবুজ মিয়া সেই দিন থেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন তিনবার হাসির অনুশীলন শুরু করলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
"চাচা, ব্যাপার কী?"
চাচা লাজুক গলায় বললেন,
"দেখ, মানুষ স্বপ্ন নিয়েই বাঁচে। যদি জেলা ভিত্তিক বিয়ের মৌসুম শুরু হয়, তাহলে আমারও তো নাগরিক অধিকার আছে!"
চাচার বয়স তখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে জন্মদিনের কেকের মোমবাতি গুনতে গেলে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি লাগে।
তবু স্বপ্ন দেখতে তো কর লাগে না!
এদিকে গ্রামের চায়ের দোকানে আরেক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সালাউদ্দিন নামের মানুষ নাকি খুব রসিক হয়।
একজন বলল,
"রসিক তো বটেই, প্রেমিকও হয়।"
আমি তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করলাম,
"না না, আমার নামের কথা বলতেছো না তো?"
লোকজন একসঙ্গে বলল,
"আপনার কথা না। আপনার বন্ধু জাকিরের কথা!"
আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
কিন্তু সেই স্বস্তি পাঁচ সেকেন্ডও টিকল না।
চায়ের কাপ হাতে এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বললেন,
"দেশ একজন অলরাউন্ডার মন্ত্রীও পাইছে।"
আমি আবার কৌতূহলী হলাম।
"নাম কী?"
লোকটা কাশতে কাশতে বলল,
"সালাউদ্দিন।"
আমি দ্রুত হাত নেড়ে বললাম,
"না না, আমি বলি নাই!"
সে বলল,
"আপনি না, বিরোধী দলের নেতারাই বলতেছে!"
চায়ের দোকানে তখন এমন হাসির বিস্ফোরণ ঘটল যে পাশের তিনটি কাপে থাকা চা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে গিয়ে টেবিলে পড়ে গেল।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়;
তো সবুজ মিঞা সেই সালাউদ্দিন মার্কা রসিকতা আর প্রেমিক সত্তাকে আদর্শ মেনে রীতিমতো মাঠে নামার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।
তিনি মনে মনে হিসেব কষতে লাগলেন, এই প্রস্তাব পাস হলে তাঁর মতো বিচক্ষণ প্রৌঢ়রা নতুন উদ্যমে জেলায় জেলায় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারবেন!এখন দেখার বিষয়, সবুজ চাচার এই রঙিন স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়, নাকি শুধুমাত্র সংসদের জাতীয় সংসদ বিতর্কের টেবিলেই ঝুলে থাকে!
তবে গ্রামের মানুষ শেষ পর্যন্ত একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাল।
দাড়ি দেখলে দুলাভাই ভাবা যাবে না।
চুলে ফিতা বাঁধলে কবি, শিল্পী কিংবা রকস্টারও হতে পারে।
জেলায় জেলায় বিয়ের স্বপ্ন দেখা দোষের কিছু নয়।
আর সালাউদ্দিন নাম শুনলেই কাউকে প্রেমিক, রসিক কিংবা অলরাউন্ডার মন্ত্রী ভাবারও দরকার নেই।
কারণ এই দেশে নামের চেয়ে বড় পরিচয় একটাই।
যে যত বড় গল্প বানাতে পারে, সে তত বড় বিশ্লেষক।
আর যে গল্প শুনেও হাসতে পারে, সে-ই প্রকৃত সুখী মানুষ।
রম্যলেখক , ঢাকা