আধুনিক নাগরিক জীবনে অনেক সময় প্রচলিত আইন বা সামাজিক মারপ্যাঁচকে ব্যবহার করে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করা হয়। কিন্তু ইসলামী শরিয়াহর বিধান এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর, স্পষ্ট এবং আপসহীন। শরিয়াহ আইন স্পষ্ট বলে, কোনো নারী যদি তার প্রথম স্বামীর থেকে শরিয়াহসম্মত উপায়ে মুক্ত বা তালাকপ্রাপ্ত না হন, তবে রাষ্ট্র বা সমাজ তাকে যে স্বীকৃতিই দিক না কেন, আল্লাহর দরবারে তার দ্বিতীয় বন্ধনটি একটি 'অবৈধ বা বাতিল চুক্তি'। ফলশ্রুতিতে, সেই সম্পর্কের ছায়াতলে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত অনন্তকালের ব্যভিচারের স্রোতধারায় রূপ নেয়।
১. পবিত্র কুরআনের অমোঘ ঘোষণা: সধবা নারী নিষিদ্ধ
ইসলামে বিবাহিত নারী (সধবা)-কে অন্যের জন্য সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সূরা আন-নিসার ২৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
"আর (তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে) স্বামীদের বন্ধনে থাকা সধবা নারীদের..."
যতক্ষণ পর্যন্ত প্রথম স্বামী স্ত্রীকে তালাক না দিচ্ছেন অথবা স্ত্রী ইসলামী আদালতের মাধ্যমে 'খুলা' বা বিবাহ বিচ্ছেদ না করাচ্ছেন এবং নির্দিষ্ট ইদ্দতকাল (তিন ঋতুস্রাব সময়) পার না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ নারী অন্য কোনো পুরুষের জন্য হালাল হতে পারেন না।
২. বিয়ে নয়, বরং তা অনন্ত ব্যভিচারের নামান্তর
প্রথম বিয়ের বন্ধন বহাল থাকা অবস্থায় কেউ যদি কোর্ট ম্যারেজ বা কোনো সামাজিক উপায়ে পুনরায় বিয়ের নাটক সাজায়, তবে ইসলামী ফিকাহর পরিভাষায় একে বলা হয় 'নিকাহে বাতিল' বা বাতিল বিয়ে। ইমাম ইবনুল কুদামাহ (র.)-সহ শীর্ষস্থানীয় ফকিহদের মতে, এই ধরনের বিয়ের কোনো অস্তিত্ব শরিয়াহতে নেই।
ফলে, এই মেকি বিয়ের পর তারা যত বছরই একসঙ্গে থাকবেন, যতবারই শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হবেন, তার প্রতিটিই হবে ব্যভিচার (জিনা)। শরিয়াহর দৃষ্টিতে এই পাপের কোনো শেষ নেই, যতক্ষণ না তারা এই সম্পর্ক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে খাঁটি মনে তওবা করছেন।
৩. বংশধারা ও সন্তানের বৈধতার সংকট
ইসলামী শরিয়াহর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষের 'নাসাব' বা বংশধারা রক্ষা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“সন্তান তারই হবে যার বিছানায় সে জন্ম নিয়েছে।” (সহিহ বুখারি: ২০৫৩)
যেহেতু নারীটি পূর্বের স্বামীর বন্ধনে আবদ্ধ, তাই এই অবৈধ মেলামেশার মাধ্যমে যদি কোনো সন্তান জন্ম নেয়, তবে শরিয়াহর জটিল নীতি অনুযায়ী সেই সন্তান জৈবিক পিতার বংশপরিচয় পাবে না এবং সে পিতার উত্তরাধিকার থেকেও বঞ্চিত হবে। এটি মূলত সমাজের একটি প্রজন্মকে পরিচয়হীনতার অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
৪. আধুনিক মনস্তত্ত্ব ও সমাজব্যবস্থায় এর প্রভাব
ইসলামের এই বিধানটিকে কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের আলোকেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
- পরিবারের বিশৃঙ্খলা: একটি চলমান বিয়ে টিকিয়ে রেখে অন্য সম্পর্কে জড়ানো কেবল ধর্মীয় অপরাধ নয়, বরং তা পূর্বের স্বামী এবং সন্তানদের মানসিক ও সামাজিক জীবন ধ্বংস করে দেয়।
- প্রতারণার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: তালাক গোপন করে বা ভুয়া কাগজ বানিয়ে বিয়ে করা এক ধরনের জঘন্য জালিয়াতি। ইসলাম এই ধরনের ধোঁকাবাজিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
৫. আখিরাতের অনন্ত শাস্তি ও মুক্তির উপায়
ইসলামে বিবাহিত অবস্থায় ব্যভিচারের শাস্তি অত্যন্ত ভয়াবহ। সূরা আল-ফুরকানের ৬৮-৬৯ আয়াতে আল্লাহ বলেন, যারা ব্যভিচার করে তারা কেয়ামতের দিন দ্বিগুণ শাস্তি ভোগ করবে এবং সেখানে লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল থাকবে।
তবে ইসলামের দরজা সবসময় অনুশোচনার জন্য খোলা। এই অন্তহীন পাপের স্রোত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো:
১. অবিলম্বে এই অবৈধ সহবাস ও সম্পর্ক ত্যাগ করে আলাদা হয়ে যাওয়া।
২. পূর্বের স্বামীর সাথে শরিয়াহসম্মত উপায়ে তালাক বা বিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।
৩. অতীত ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে লজ্জিত হয়ে খাঁটি অন্তরে তওবা (তওবায়ে নাসুহা) করা।
উপসংহার:
মানুষের তৈরি আইন বা সাময়িক সামাজিক ছাড় হয়তো ক্ষণিকের জন্য একটি অবৈধ সম্পর্ককে আড়াল করতে পারে, কিন্তু তা পরম সত্যকে পরিবর্তন করতে পারে না। শরিয়াহর অমোঘ নিয়ম লঙ্ঘন করে অন্যের স্ত্রীকে নিয়ে ঘর করা মূলত নিজেকে অনন্তকালীন পাপের আগুনে পুড়িয়ে মারার শামিল। পারিবারিক ও আত্মিক পবিত্রতা রক্ষায় ইসলামী শরিয়াহর এই সুষ্পষ্ট সীমারেখা মেনে চলাই আধুনিক সুস্থ সমাজের একমাত্র পথ।
লেখক ও কলামিস্ট
(ধর্মীয় বিশেষ প্রতিবেদন)