আবহাওয়া অফিসে একদিন: যেখানে ঝড় ওঠে কেবল চায়ের কাপে! | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আবহাওয়া অফিসে একদিন: যেখানে ঝড় ওঠে কেবল চায়ের কাপে!

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
আবহাওয়া অফিসে একদিন: যেখানে ঝড় ওঠে কেবল চায়ের কাপে!
আবহাওয়া অফিসে একদিন: যেখানে ঝড় ওঠে কেবল চায়ের কাপে!
ছবি: সংগৃহীত
- সালাউদ্দিন আকবর , ঢাকা
 
দেশ বিচিত্রার সম্পাদক হিসেবে আমার বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে, কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে কাটানো সেই বিশেষ দিনটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ‘রম্য অধ্যায়’ হয়ে থাকবে। আবহাওয়াবিদদের চায়ের আমন্ত্রণে গিয়েছিলাম পূর্বাভাস কীভাবে তৈরি হয় তা দেখতে, কিন্তু গিয়ে যা দেখলাম—তাতে বুঝলাম এনাদের নিজেদের জীবনের পূর্বাভাসই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিত!
 
সকাল সকাল অফিসে ঢুকেই চোখ চড়কগাছ। পুরো অফিস জুড়ে এক শান্ত, সুশীতল পরিবেশ। কোথাও কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস নেই, সাইক্লোনের সাইরেন নেই। সবাই যার যার মতো ‘ব্যস্ত’।
 
এক কোনায় বিশাল মনিটরের সামনে গম্ভীর মুখে বসে আছেন এক জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ। আমি ভাবলাম, নিশ্চয়ই বঙ্গোপসাগরের কোনো গভীর নিম্নচাপের গতিপথ মাপছেন। কৌতুহল সামলাতে না পেরে পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম, তিনি স্ক্রিনে স্যাটেলাইটের ম্যাপ খুলে খুব মনোযোগ দিয়ে ফোনে বউয়ের সাথে তরকারির বাজার নিয়ে দরদাম করছেন।
ফোনে ওপাশ থেকে ভেসে আসা ‘গর্জন’ শুনে ভদ্রলোক কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "হাঁ, শুনছ? আজ কিন্তু বাজারে তোমার মেজাজের পারদ বেশ ঊর্ধ্বমুখী! বাসায় ফিরতে ফিরতে আমার ওপর দিয়ে কালবৈশাখী বয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখছি। শান্ত হও, প্লিজ!" বুঝলাম, সাগরের নিম্নচাপের চেয়ে ঘরের ভেতরের চাপ সামলাতেই তাঁর এনার্জি শেষ।
 
একটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল আরেকটি ডেস্ক। সেখানে এক তরুণ কর্মকর্তা পাশের ডেস্কের এক নবাগতা তরুণী সহকর্মীর দিকে তাকিয়ে বেশ রোমান্টিক ভঙ্গিতে হাত নাড়ছেন। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তিনি বলছেন, "বুঝলেন মিস রিয়া, আপনি এই অফিসে আসার পর থেকে আমার মনের আকাশের মেঘ কেটে একদম ঝকঝকে রোদেলা আবহাওয়া বিরাজ করছে। অথচ পাঁচ বছর আগে যখন আমার প্রথম প্রেমিকা ব্রেকআপ করল, তখন আমার জীবনে হুট করেই যেন রিক্টার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়ে গিয়েছিল! মনটা যেন টর্নেডোর মতো লণ্ডভণ্ড..." তরুণীটি লজ্জায় লাল হয়ে ফাইল দিয়ে মুখ ঢাকল। আবহাওয়ার ফাইল আটকে সেখানে তখন চলছে ‘স্মৃতির কিচ্ছা’র মহোৎসব!
 
দুপুরের দিকে আরেক ডেস্কে গেলাম। সেখানে চার-পাঁচজন গোল হয়ে বসে মুড়ি মাখানো খাচ্ছেন আর তুমুল আড্ডা দিচ্ছেন। টিভিতে তখন স্ক্রল যাচ্ছে—'আজ দেশের কোথাও কোথাও হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে।'
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "ভাই, আজ কি আসলেই বৃষ্টি হবে? ছাতা তো আনিনি।"
একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা মুড়ি চিবোতে চিবোতে অত্যন্ত দার্শনিক ভঙ্গিতে বললেন, "দেখুন সম্পাদক সাহেব, আকাশের পূর্বাভাস আর আমাদের অফিসের স্টাফদের কাজের গতি—দুইটাই প্রকৃতির নিয়মে চলে, কারও কথায় না। আমরা বলি বৃষ্টি হবে, আকাশ বলে ‘হব না’। আবার আমরা যখন বলি রোদ থাকবে, আকাশ তখন ডুকরে কেঁদে ওঠে। প্রকৃতির সাথে আমাদের এই ‘যোজন যোজন ফারাক’ই তো আমাদের সম্পর্কের সৌন্দর্য! মিল হয়ে গেলে তো রহস্যই থাকল না।"
 
বিকেলের দিকে বিদায় নেওয়ার সময় ডিরেক্টর সাহেব এক গাল হেসে বললেন, "সম্পাদক সাহেব, আমাদের পূর্বাভাস কেমন লাগল?"
আমি হেসে বললাম, "ভাই, আপনাদের এখানে আকাশের পূর্বাভাস বা সাগরের নিম্নচাপ—কোনোটাই আপনাদের সাথে মিতালী করে না। কিন্তু আপনাদের আড্ডা, প্রেম আর সাংসারিক দূর্যোগের যে পূর্বাভাস আমি দেখলাম, তা ১০০ ভাগ নির্ভুল! দেশের আবহাওয়া যেমনই হোক, আপনাদের ভেতরের আবহাওয়া সবসময়ই চমৎকার!"
 
অফিস থেকে বের হয়েই দেখলাম কড়া রোদ। অথচ পকেট থেকে ফোন বের করে আবহাওয়া অফিসের অ্যাপে দেখলাম লেখা—'বজ্রসহ তীব্র বৃষ্টিপাত'। আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম, আসলেই! আবহাওয়া অফিসের আসল ঝড় তো অফিসের ভেতরেই রয়ে গেছে, বাইরে আসার সময় পায় না!
 
 
রম্য লেখক , ও প্রাবন্ধিক 
Abdul Kader
Abdul Kader ago 4 months
চমৎকার, হা হা হা, দারুণ
0 0 תשובה
להראות יותר


News Card Generator