একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাতেও ঔপনিবেশিক আমলের শোষণ ও কণ্ঠরোধের কালো ছায়া দৃশ্যমান হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি, অলিগার্কদের (স্বার্থান্বেষী প্রভাবশালী গোষ্ঠী) একচেটিয়া আধিপত্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি দেশের সাধারণ জনগণকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। জনগণের সঞ্চয় শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি গুটিকয়েক মানুষের পকেটে চলে যাওয়ায় ১৭৫৭ সালের পলাশীর ট্র্যাজেডির মতো অর্থনৈতিক পরাধীনতার কালো মেঘ ধেয়ে আসছে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এক সময় ভয়াবহ সামাজিক বিশ্ঙ্খলার মতো ভয়াবহ সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জনগণের আস্থার সংকট
- আস্থার চিরতরে বিলোপ: ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া এবং ঋণখেলাপিদের বিচার না হওয়ায় ব্যাংকে আমানত রাখার প্রতি জনগণের আস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।
- অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির উত্থান: ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে মানুষ ব্যাংকে টাকা জমানো বন্ধ করে দেবে। এর ফলে হুন্ডি, নগদ টাকা ঘরে জমিয়ে রাখা এবং চোরাচালানের মতো সমান্তরাল ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
- মূলধন পাচার ও বিনিয়োগ স্থবিরতা: দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ অনিরাপদ মনে করে দেশীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ বন্ধ করবেন এবং বৈধ-অবৈধ উপায়ে মূলধন বিদেশে পাচার করবেন। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।
“বাস্তব চিত্র: ইসলামী ব্যাংক ও সম্মিলিত ৫ ব্যাংকের অচলবস্থা"
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সম্প্রতি দেশের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এবং একীভূত ৫টি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর কার্যহীনতা ও তারল্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
নিচে এই দুটি প্রধান খাতের বর্তমান অচলবস্থা, কারণ এবং অর্থনীতিবিদদের মতামত সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. সম্মিলিত ৫ ব্যাংকের অচলবস্থা ও কার্যহীনতা
- পটভূমি: সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এস আলম গ্রুপ ও অন্যান্য প্রভাবশালী মহলের বেনামী ঋণ ও ব্যাপক লুটপাটের শিকার ৫টি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে (ফার্স্ট সিকিউরিটি, সোশ্যাল ইসলামী, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক) একীভূত করে সরকারি নিয়ন্ত্রণে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়।
- বর্তমান সংকট: ব্যাংকটি গঠনের সাড়ে চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও কোনো স্থায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ দেওয়া যায়নি। পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়াও পদত্যাগ করেছেন।
- কার্যহীনতার ধরণ: শীর্ষ নেতৃত্বহীনতার কারণে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হাজার হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা এবং আমানত বীমা তহবিল থেকে টাকা দিলেও গ্রাহকদের চাহিদামতো আমানত ফেরত দিতে পারছে না, যার ফলে আমানতকারীরা প্রতিনিয়ত বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করছেন।
২. ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর বর্তমান অস্থিরতা
- টাকা তোলার হিড়িক: সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের আতঙ্কের কারণে মাত্র এক সপ্তাহে ব্যাংকটি থেকে ৪,২৪০ কোটি টাকারও বেশি আমানত তুলে নেওয়া হয়েছে।
- সিআরআর (CRR) বিপর্যয়: ব্যাপক হারে আমানত উত্তোলনের ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকের জমা রাখা ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) পজিটিভ থেকে রাতারাতি নেগেটিভ বা ঘাটতি পর্যায়ে নেমে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইসলামী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জরুরি ১০,০০০ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চেয়েছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক কুফলসমূহ
- তীব্র মুদ্রাস্ফীতি ও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা: অলিগার্ক বা সিন্ডিকেট চক্রের হাতে বাজার ব্যবস্থা জিম্মি থাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে। এর ফলে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী পুষ্টিহীনতা ও তীব্র খাদ্য সংকটে পড়বে।
- মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিলুপ্তি ও চরম দারিদ্র্য: ক্রমাগত সঞ্চয় শেষ হতে থাকায় মধ্যবিত্ত শ্রেণী ক্রমান্বয়ে দরিদ্র শ্রেণীতে পরিণত হবে। সমাজে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান আকাশচুম্বী রূপ ধারণ করবে, যা যেকোনো সুস্থ সামাজিক কাঠামোর জন্য ধ্বংসাত্মক।
- মেধা পাচার (Brain Drain): দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ ও দক্ষ যুবসমাজ দলে দলে দেশত্যাগ করবে। এর ফলে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে নেতৃত্ব ও দক্ষ জনবলহীন হয়ে পড়বে।
সামাজিক বিস্ফোরণ ও ভয়াবহ সামাজিক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা
যখন একটি দেশের সিংহভাগ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, ক্ষুধার্ত ও নিঃস্ব জনগণ বেঁচে থাকার তাগিদে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়। অলিগার্কদের হাতে রাষ্ট্রের জিম্মি দশা এবং সরকারের নিষ্ক্রিয়তা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গে রূপ দিতে পারে। আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি, খাদ্য ও সম্পদের জন্য ছিনতাই-লুটপাট এবং শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণবিস্ফোরণ দেশকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত অভ্যন্তরীণ সংঘাত বা গণবিষ্ফোরণের দিকে ধাবিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত :
- ড. শহীদুল ইসলাম (অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক):
তিনি মনে করেন, যে উদ্দেশ্যে ৫টি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক করা হয়েছিল, তার বিন্দু পরিমাণও পূরণ হয়নি। লুটপাটকারী ও টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আমানতকারীদের অর্থ আটকে রাখা কিংবা দায় চাপানো বড় অন্যায়। ব্যাংকিং খাতের এই অনিয়মের রাজনৈতিক ও আইনি বিচার না হলে সংকট বারবার ফিরে আসবে। - আরিফ হোসেন খান (বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও কর্মকর্তা):
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংককে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক বড় করার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে সেই ব্যাংকের অস্তিত্বের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
সারসংক্ষেপ: বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং খেলাপি ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর অ্যাকশন ছাড়া কোনো ব্যাংককে স্রেফ কৃত্রিমভাবে বা রাষ্ট্রীয় টাকা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ব্যাংকের প্রতি জনগণের এই 'আস্থার সংকট' পুরো অর্থনীতিকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
উপসংহার ও উত্তরণের উপায়
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পলাশীর শেষ নিঃশ্বাস থেকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে সরকারকে কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা, টাকা পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া, বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং জনগণের বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, কেবল ক্ষমতার চেয়ার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা রাষ্ট্র ও জনগণকে এক ভয়াবহ ও অপরিবর্তনীয় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
(লেখক ও কলামিস্ট )