সীমান্তের চোরাবালি: ‘পুশ-ইন’ সংকটে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সীমান্তের চোরাবালি: ‘পুশ-ইন’ সংকটে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি..

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
সীমান্তের চোরাবালি: ‘পুশ-ইন’ সংকটে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি..
সীমান্তের চোরাবালি: ‘পুশ-ইন’ সংকটে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি..
ছবি: সংগৃহীত
রাতের আঁধারে বেয়নেটের মুখে কিছু মানুষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কাঁটাতারের ওপারে।
- সালাউদ্দিন আকবর, ঢাকা..
মেদিনীপুরের আকাশ ভেঙে যখন কালবৈশাখী নামার উপক্রম, ঠিক তখন বেনাপোল কিংবা কুড়িগ্রামের দুর্গম জিরো পয়েন্টে এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য খেলা করে। এই নৈঃশব্দ্য শান্তির নয়, বরং একতরফা এক রাষ্ট্রীয় জবরদস্তির। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই, নেই কোনো কূটনৈতিক লালফিতার আদান-প্রদান; কেবল রাতের আঁধারে বেয়নেটের মুখে কিছু মানুষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কাঁটাতারের ওপারে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এই অলিখিত পুশ-ইন প্রক্রিয়া এখন আর কেবল ‘অনুপ্রবেশ’ বা ‘বহিষ্কারের’ চেনা সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি রূপ নিয়েছে একবিংশ শতাব্দীর এক সুক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক আগ্রাসনে।
 
একতরফা জবরদস্তি: দায়ভার কার কাঁধে?
 
আন্তর্জাতিক আইনের সনাতন প্রথাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভারত যেভাবে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দিচ্ছে, তার দায়ভার এককভাবে দিল্লির নীতি-নির্ধারকদের।
  • দিল্লির আইনি দেউলিয়াত্ব: কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশে ফেরত পাঠাতে হলে তার নাগরিকত্ব প্রমাণ এবং দ্বিপাক্ষিক কনস্যুলার এক্সেস বাধ্যতামূলক। ভারত এই আইনি পথে না হেঁটে চোরাপথ বেছে নিচ্ছে, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অমর্যাদা।
  • ভোটব্যাংক ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বলি: ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মেরুকরণ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী ন্যারেটিভের দায়ভার চাপানো হচ্ছে বাংলাদেশের ঘাড়ে। আসামের এনআরসি কিংবা সিএএ-র পর থেকে যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করা হয়েছিল, পুশ-ইন তারই এক নগ্ন বাস্তব রূপ।
  • ঢাকার কূটনৈতিক জড়তা: দীর্ঘকাল ধরে প্রতিবেশীর এই অন্যায় আচরণে ঢাকার ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতি বা অতি-নরম কূটনৈতিক অবস্থানও এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করার জন্য আংশিক দায়ী। শক্ত প্রতিবাদের অভাব দিল্লিকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
 
আগাম সংঘাতের বারুদ: কোন দিকে এগোচ্ছে সীমান্ত?
 
এই পুশ-ইন প্রক্রিয়া কেবল কিছু মানুষের বাস্তুচ্যুতি নয়, এটি মূলত দুই দেশের সীমান্তে এক টাইম-বোমা ফিট করে রাখার শামিল। আসন্ন দিনগুলোতে যে ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে:
  • সীমান্তে সামরিক রক্তক্ষরণ: বিজিবি এবং বিএসএফ-এর মধ্যে ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের চেনা সৌজন্য ভেঙে পড়তে পারে। একপক্ষ ঠেলে দিতে চাইলে এবং অন্যপক্ষ তা রুখে দাঁড়াতে বাধ্য হলে, জিরো পয়েন্টে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের অস্ত্রের গর্জন বা প্রাণঘাতী সংঘর্ষ অবধারিত।
  • স্থানীয় জনবিস্ফোরণ ও জাতিগত দাঙ্গা: সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যেই চরম ক্ষুব্ধ। পুশ-ইনের শিকার মানুষদের ওপর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ আছড়ে পড়লে তা এক নতুন ধরনের মানবিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।
  • পানি ও ট্রানজিটের দরকষাকষিতে অচলাবস্থা: সীমান্ত যদি এই পুশ-ইনের কারণে অশান্ত হয়ে ওঠে, তবে তিস্তার পানি বণ্টন, গঙ্গার চুক্তি নবায়ন কিংবা ভারতের ট্রানজিট সুবিধার মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলো চরম অচলাবস্থার মুখে পড়বে। ঢাকার জনমত দিল্লির বিরুদ্ধে এতটাই কঠোর হবে যে কোনো সরকারের পক্ষেই একতরফা সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে না।
 
উপসংহার: কাঁটাতারের কান্না বনাম সার্বভৌমত্বের হুংকার
পুশ-ইন কোনো আইনি সমাধান নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর অন্য রাষ্ট্রের নীরব অনুপ্রবেশ। দিল্লি যদি মনে করে পুশ-ইনের মাধ্যমে তারা তাদের অভ্যন্তরীণ 'অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের দায়’ প্রতিবেশীর উঠোনে ফেলে পার পেয়ে যাবে, তবে তা হবে এক ঐতিহাসিক ভুল হিসাব।
বাংলাদেশ আজ আর কেবল ‘নরমপন্থী’ রাষ্ট্র নয়; ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের এই ক্রান্তিকালে এই পুশ-ইন আগ্রাসন রুখতে ঢাকাকে এখন 'কঠোর ও আপসহীন কূটনৈতিক নীতিতে' এগোতে হবে। অন্যথায়, সীমান্তের এই ধূসর ধূলিকণা একদিন দুই দেশের বন্ধুত্বের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে।
コメントがありません


News Card Generator