- সালাউদ্দিন আকবর, ঢাকা
পরিবেশকে আমরা প্রায়ই গাছ, নদী, পাহাড় কিংবা আকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখি। অথচ পরিবেশ তার চেয়েও অনেক বিস্তৃত। মানুষের জীবনযাপন, চিন্তা, অনুভূতি, সংস্কৃতি ও সৃষ্টিশীলতার ভেতরেও পরিবেশের গভীর উপস্থিতি রয়েছে। একজন মানুষ যেভাবে পৃথিবীকে দেখে, উপলব্ধি করে এবং তার চারপাশের বাস্তবতাকে ধারণ করে, সেখানেই পরিবেশের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়।
প্রকৃতি, জীবন ও ভাবনা একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। ক্ষুধার্ত পানকৌড়ি যেমন জলতল থেকে শামুক তুলে আনে নিজের অস্তিত্বের প্রয়োজনে, তেমনি মানুষও প্রকৃতির বুকে ছড়িয়ে থাকা সৌন্দর্য, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে সংগ্রহ করে নিজের চিন্তার জগৎ নির্মাণ করে। সেই নির্মাণশিল্প থেকেই জন্ম নেয় সাহিত্য, শিল্পকলা, সংস্কৃতি এবং সভ্যতার অনন্য প্রকাশ।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রকৃতিই মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। পলাশীর আম্রকানন কিংবা রমনার বটমূল কেবল ঐতিহাসিক স্থান নয়, তারা সময়ের দীর্ঘ যাত্রার নীরব সাক্ষী। রাজনীতি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের নানা ঘটনাপ্রবাহ সেখানে ঘটেছে বটে, কিন্তু প্রকৃতি তার নিজস্ব মহিমায় সেই ঘটনাগুলোকে ধারণ করে রেখেছে যুগের পর যুগ।
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ সংকট কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও জীবনবোধের পরিবর্তনের সঙ্গেও পরিবেশের ভবিষ্যৎ জড়িত। যে প্রজন্ম প্রকৃতিকে কেবল ভোগের উপাদান হিসেবে দেখবে, তারা পরিবেশ হারাবে। আর যে প্রজন্ম প্রকৃতিকে জীবন, ইতিহাস ও মানবচেতনার অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে, তারাই একটি সুন্দর ও টেকসই পৃথিবী নির্মাণ করতে পারবে।
আগামীর প্রজন্মের জন্য তাই পরিবেশ রক্ষার শিক্ষা শুধু বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাদের শেখাতে হবে প্রকৃতিকে অনুভব করতে, ইতিহাসকে বুঝতে, সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করতে এবং জীবনকে প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গড়ে তুলতে। কারণ পরিবেশ কোনো বাহ্যিক বিষয় নয়; এটি আমাদের অস্তিত্ব, উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যতের সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি।
প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, ইতিহাসের প্রতি সচেতনতা এবং মানবিক চেতনার বিকাশই পারে আগামী পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে। পরিবেশ তখন আর শুধু একটি শব্দ থাকবে না, হয়ে উঠবে মানবসভ্যতার সবচেয়ে মূল্যবান রাজকীয় উত্তরাধিকার।