জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) জেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। দলের বড় একটি অংশের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ বর্তমান প্রধান সমন্বয়ক জান্নাতুল ফেরদৌস টনির বিরুদ্ধে 'একনায়কতন্ত্র', পরিবারকরণ এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিতর্কিত ব্যক্তিদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টার অভিযোগ এনে তাকে গণবয়কট ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন।
ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের দাবি, প্রধান সমন্বয়কের এমন বিতর্কিত ও স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের কারণে জেলা এনসিপি দিন দিন নিষ্ক্রিয় ও সাধারণ মানুষের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে পড়ছে।
মূল কাঠগড়ায় প্রধান সমন্বয়ক জান্নাতুল ফেরদৌস টনি
প্রতিবেদনে প্রকাশ, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে দৃশ্যমান কোনো অবদান না রেখেও কেবল আর্থিক প্রভাব খাটিয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস টনি প্রধান সমন্বয়কের পদ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন দলের একাংশ। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি দলকে নিজের 'পারিবারিক পকেটে' পরিণত করেছেন বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে।
বিক্ষুব্ধ নেতারা জানান, একই পরিবারের তিন আপন ভাই এনসিপির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যার মধ্যে বড় ভাই নিজেই জেলা প্রধান সমন্বয়ক। এই 'পরিবারকরণ' নীতির কারণে দলের ত্যাগী ও মূল ধারার নেতাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, টনি নিজের একক কর্তৃত্ব ও কোরাম ভারী করার জন্য সম্প্রতি জুলাই বিপ্লবে আহতদের নামে একটি কৃত্রিম প্রোগ্রাম আয়োজন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, সেখানে মূল আহতদের ও প্রকৃত নেতৃবৃন্দকে বাদ দিয়ে এমন কিছু বিতর্কিত মুখকে স্টেজে বসানো হয়, যাদের সাথে এনসিপির সাধারণ কর্মীদের চরম বিরোধ রয়েছে। এই রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং আর্থিক লেনদেনের সুবিধার জন্য তিনি দলকে ভাঙনের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন বলে জেলা নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন:
"জান্নাতুল ফেরদৌস টনি একজন স্বৈরাচারী। তার এই একনায়কতন্ত্র আমরা মেনে নেব না। অবিলম্বে তাকে এনসিপির সকল অঙ্গসংগঠন থেকে বয়কট ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হবে।
এই রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে উঠে এসেছে আলী মোজাহিদ নামে এক নেতার নাম, যাকে কেন্দ্র করে এনসিপির ভেতরে তীব্র কাদা-ছোড়াছুড়ি চলছে। বিরোধী শিবিরের একাংশের দাবি, মোজাহিদ জামায়াতের সাবেক রোকন এবং ২০২৪ সালের আগস্টের পর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসার পর তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠায় ২০২৫ সালের কমিটিতে তাকে রাখা হয়নি। এমনকি তিনি দলবিরোধী লেখালেখিও করেছেন।
তবে মোজাহিদের অনুসারী ও নিরপেক্ষ সূত্রগুলো বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের মতে, নাগরিক কমিটির আত্মপ্রকাশের শুরু থেকেই মোজাহিদ সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে তার একটি নিজস্ব গ্রহণযোগ্যতা ছিল। সম্প্রতি তাকে জামাতে রোকন পথ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং অভিযোগটা ছিল চাঁদাবাজী। চাঁদাবাজির অভিযোগে একদল থেকে বহিষ্কৃত নেতাকে আমরা কোনভাবেই আমাদের নিজেদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করবো না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাবেক শিবির নেতা ও এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য সুলতান মারুফ তালহার উপস্থিতিও এই রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিক্ষুব্ধ এনসিপি নেতৃবৃন্দ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অন্য দল থেকে বহিষ্কৃত বা বিতর্কিত কাউকে যদি জান্নাতুল ফেরদৌস টনি তার ব্যক্তিগত স্বার্থে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেন, তবে তৃণমূলের কর্মীরা তা রাজপথে প্রতিহত করবে। অন্য দলের 'ফেলে দেওয়া' কোনো উপাদানকে এনসিপির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে দেওয়া হবে না।
এই বিষয়ে প্রধান সমন্বয়ক জান্নাতুল ফেরদৌস টনির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।