বর্তমান সরকারের যাত্রা শুরুর মাত্র ৬০ দিনের মাথায় দেশ ও বিদেশে বড় ধরনের ‘ইমেজ সংকটের’ মুখে পড়েছে প্রশাসন। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান ‘মব কালচার’ (উশৃঙ্খল জনতা) নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরকারকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। গত শনিবার (২৫ এপ্রিল) এক ভিডিও বার্তায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এমন উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি।
১. ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বনাম রূঢ় বাস্তবতা
প্রায় ১৭ বছর পর লন্ডনের নির্বাসিত জীবন শেষ করে দেশে ফিরে জনাব তারেক রহমান ৩শ ফিট এলাকায় আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের আদলে ঘোষণা করেছিলেন, “আই হ্যাভ এ প্ল্যান” (আমার একটি পরিকল্পনা আছে)। কিন্তু রনির মতে, তারেক রহমান তার পিতা জিয়াউর রহমানের মতো ‘ভাগ্যবান’ নন। তিনি ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই বৈশ্বিক যুদ্ধবিগ্রহ এবং তেলের বাজারের অস্থিরতা প্রশাসনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে, যা সাধারণ মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশায় ধাক্কা দিয়েছে।
২. মব কালচার ও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি
প্রতিবেদনে গোলাম মাওলা রনি অভিযোগ করেন যে, সরকার বর্তমানে ‘মব’ বা উশৃঙ্খল জনতা নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে ক্ষেত্রবিশেষে মব দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।
-
আক্রমণ ও তান্ডব: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগে ডাকসু নেতাদের ওপর হামলা, বিভিন্ন মাজারে তান্ডব এবং পীরকে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনাগুলো আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি প্রমাণ করে।
-
আর্থিক মব: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরকে তাড়ানোর প্রক্রিয়াটিকে তিনি একটি ‘ফাইন্যান্সিয়াল মব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।
৩. সোশ্যাল মিডিয়া ট্রল ও ‘ইমেজ’ সংকট
সরকারের মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতাদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলমান বিদ্রূপ বা ‘ট্রল’ এখন চরমে।
-
হেরিকেন ও কেরোসিন: বিদ্যুৎ ও তেলের সংকট নিয়ে “হেরিকেন কিনেছেন তো?”—এমন সব ট্রল এখন ৫-৬ বছরের শিশুদের মুখেও শোনা যাচ্ছে। রনির মতে, যখন সমাজের মানুষ কোনো শাসককে নিয়ে এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, তখন তার পক্ষে ভালো কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
-
খাম্বা বনাম গুপ্ত: বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ‘খাম্বা’ এবং ‘গুপ্ত’ (Secret) শব্দ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে গত কয়েক দিনে সারাদেশে অন্তত ২০-২৫টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে।
৪. আন্তর্জাতিক চাপ ও জুলাই সনদ
ব্রেমার বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে রনি জানান, জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সরকারকে এখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না। বিশেষ করে ‘জুলাই সনদ’ (সংস্কার প্রস্তাব) বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ নিয়ে দ্বিমুখী অবস্থানের কারণে সরকার আন্তর্জাতিক চাপে রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ ইতিমধ্যে সরকারকে সতর্ক করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
গোলাম মাওলা রনি তার বক্তব্যে সরকার ও বিরোধী দল—উভয় পক্ষকেই তাদের ইমেজ উদ্ধারের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কেবল জিডিপি বাড়ানো বা তেলের লাইন নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না, সবার আগে জনমনে এবং আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায় এই ইমেজ সংকট আগামী দিনে বড় কোনো রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।