সুমন হাওলাদার
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মাঝে মাঝে রঙিন ধর্মীয় লিফলেট বিতরণের ঘটনা চোখে পড়ে। এসব লিফলেটে প্রায়ই একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়—
“আপনি কি নিশ্চিতভাবে জানেন যে আপনি স্বর্গে যাবেন?”
এই প্রশ্ন সাধারণ কোনো প্রশ্ন নয়। এটি মানুষের অন্তরের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়—মৃত্যু, মুক্তি ও পরকালের অনিশ্চয়তাকে স্পর্শ করে। জীবনের সংগ্রামে ক্লান্ত মানুষ, ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত তরুণ কিংবা মৃত্যুর বাস্তবতা অনুভব করা বয়স্কদের মনে এ ধরনের প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই গভীর প্রভাব ফেলে।
ইসলাম মুক্তি ও নাজাতের বিষয়টিকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও ন্যায়ভিত্তিকভাবে ব্যাখ্যা করে। কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—
“কেউ কারও পাপ বহন করবে না।”
(সূরা আন-নাজম: ৩৮)
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রত্যেক মানুষ নিজের বিশ্বাস ও কর্মের জন্য দায়ী। মুক্তি কোনো শর্টকাট প্রক্রিয়া নয়, বরং ঈমান, সৎকর্ম ও নৈতিক জীবনের সমন্বয়।
ইসলাম ঈসা (আ.)-কে মহান নবী হিসেবে সম্মান করে। একই সঙ্গে তাওহিদের বিষয়ে কোরআনের অবস্থান স্পষ্ট—
“তিনি জন্ম দেন না, জন্মগ্রহণও করেন না।”
(সূরা আল-ইখলাস)
এই আয়াত ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সীমারেখা নির্ধারণ করে, যেখানে আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে কোনো অস্পষ্টতার অবকাশ নেই।
সমসাময়িক বাস্তবতায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে—ধর্মীয় ভাষা শুধু লিফলেট বা ব্যক্তিগত দাওয়াতেই নয়, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কখনো কখনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা অবস্থানের সঙ্গে ধর্মীয় সাফল্য কিংবা পরকালীন মুক্তির ইঙ্গিত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
কোরআন স্মরণ করিয়ে দেয়—
“সেদিন কেউ কারও কোনো কাজে আসবে না।”
(সূরা আল-বাকারা: ৪৮)
অর্থাৎ পরকালের বিচার সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। কোনো ব্যক্তি, বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতি এ বিষয়ে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
এ ধরনের ধর্মীয় ভাষা মানুষের মনে প্রভাব ফেলে মূলত ধর্মীয় জ্ঞানের ঘাটতির কারণে। কোরআনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক দুর্বল হলে আবেগ সহজেই জ্ঞানের জায়গা দখল করে নেয়। ফলে যে কোনো ধর্মীয় শব্দচয়ন গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসলাম এ ধরনের পরিস্থিতিতে উত্তেজনা বা সংঘাতের পথ দেখায়নি। বরং নির্দেশ দিয়েছে—
“তুমি তোমার প্রভুর পথে ডাকো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে।”
(সূরা নাহল: ১২৫)
একই সঙ্গে কোরআনের আরেকটি মৌলিক নীতি হলো—
“ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৫৬)
এই নীতি শুধু বিশ্বাস গ্রহণের ক্ষেত্রেই নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও নৈতিক দিকনির্দেশনা দেয়। ভয় বা অতিরিক্ত আবেগ তৈরি করে সিদ্ধান্ত আদায় করা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই বাস্তবতায় আত্মসমালোচনার জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কি আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে জ্ঞান ও উপলব্ধির মাধ্যমে শক্ত করছি? আমরা কি পরবর্তী প্রজন্মকে প্রশ্ন করতে ও বুঝতে শেখাচ্ছি?
ইসলাম ভয় বা লোভের মাধ্যমে মানুষকে ধরে রাখে না। ইসলাম মানুষকে সচেতন, দায়িত্বশীল ও ন্যায়পরায়ণ হতে আহ্বান জানায়। স্বর্গ কোনো লিফলেটের প্রতিশ্রুতি নয়, কোনো বক্তব্যের গ্যারান্টি নয়—বরং আল্লাহর ন্যায়বিচারের ফল।
এই সময়ের সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ পথ হলো—
কোরআনের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার আলো ছড়িয়ে দেওয়া।
লিফলেটে স্বর্গের দাওয়াত, ভোটের মাঠে জান্নাতের গ্যারান্টি: ঈমানের দরজায় নীরব এক পরীক্ষা.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও
লিফলেটে স্বর্গের দাওয়াত, ভোটের মাঠে জান্নাতের গ্যারান্টি: ঈমানের দরজায় নীরব এক পরীক্ষা..
ছবি: সংগৃহীত
কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি