মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা, সমাজতন্ত্রের পথপ্রদর্শক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি—আজীবন বিপ্লবী কমরেড মণি সিংহের ৩৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, বুধবার।
কমরেড মণি সিংহ ছিলেন একজন প্রকৃত বিপ্লবী—যিনি সারাজীবন শোষিত, বঞ্চিত, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, ছিলেন আদর্শ, সততা ও ত্যাগের এক জীবন্ত প্রতীক। আজকের বাংলাদেশে যখন ন্যায্যতা, শোষণমুক্ত সমাজ ও সৎ নেতৃত্বের সংকট প্রকট, তখন মণি সিংহের মতো নেতার প্রয়োজনীয়তা আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়।
১৯০১ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায়। পরবর্তীতে মায়ের সঙ্গে চলে আসেন নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরে। শৈশবকাল থেকেই তিনি অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিলেন প্রতিবাদী। ছাত্রজীবনে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন এবং অচিরেই কৃষক ও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন—শোষিত মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তিই পারে সমাজ বদলে দিতে।
রুশ বিপ্লব থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি মার্কসবাদ–লেনিনবাদের আদর্শ গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর বিপ্লব ছিল কাগুজে নয়—ছিল বাস্তবের মাটিতে দাঁড়ানো। টংক প্রথার মতো নিষ্ঠুর শোষণের বিরুদ্ধে তিনি গরিব কৃষক ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই সংগ্রামের কারণে তাঁকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে, কিন্তু কোনোদিন ভয় পাননি, কোনোদিন মাথা নত করেননি।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও কমরেড মণি সিংহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কারাগার থেকে পালিয়ে তিনি ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের সঙ্গে যুক্ত হন এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পরও তিনি সততা, শৃঙ্খলা ও আদর্শের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন।
আজকের বাংলাদেশে যখন দুর্নীতি, দলীয় স্বার্থ, হিংসা ও বিভাজনের রাজনীতি ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে—যখন অনেকের কাছে রাজনীতি মানে ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার—তখন কমরেড মণি সিংহের মতো আদর্শবান নেতার অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়। আমার জানামতে, হয়তো তিনিই একমাত্র জাতীয় নেতা, যার ব্যাংকে ছিল না এক টাকাও, ছিল না এক শতক জমি।
অথচ তিনি চাইলে জমিদারি করে আরাম-আয়েশে জীবন কাটাতে পারতেন।
তাঁর মতো নেতারাই সমাজে ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার ভিত্তি শক্ত করতে পারেন।
কমরেড মণি সিংহ আমাদের শিখিয়েছেন—রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয়; রাজনীতি মানে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শোষণমুক্ত সমাজ গড়া, ন্যায়ের পক্ষে নির্ভীক অবস্থান। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের শিক্ষা দেয়, কিভাবে আত্মত্যাগ, আদর্শ ও সাহসিকতার মাধ্যমে একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া যায়।
১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর (আজকের এই দিনে) বার্ধক্যজনিত কারণে এই মহান বিপ্লবী আমাদের ছেড়ে চলে যান। তবে তিনি চলে গেলেও তাঁর আদর্শ আজও জীবিত—সংগ্রামী মানুষের হৃদয়ে, মেহনতী মানুষের লড়াইয়ে। আজকের প্রজন্ম ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উচিত তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হয় আরও ন্যায্য, মানবিক ও প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক।
বিপ্লবী কমরেড মণি সিংহের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক:
মোরশেদ আলম
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ কৃষক সমিতি
নেত্রকোণা জেলা কমিটি