প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উপহার দেওয়া গণঅভ্যুত্থান-কেন্দ্রিক গ্রাফিতি সংকলন বইয়ের প্রচ্ছদকে কেন্দ্র করে ভারতীয় গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ মানচিত্রের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়ানো হচ্ছে। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ফ্যাক্ট চেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম বাংলাফ্যাক্ট তাদের এক প্রতিবেদনে এই অপপ্রচার শনাক্ত করেছে।
বাংলাফ্যাক্ট জানিয়েছে, ভারতীয় মূলধারার একাধিক গণমাধ্যম একটি গ্রাফিতির ছবিকে ঘিরে নিয়মিত মনগড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করছে, যার কয়েকটিতে বিষয়টিকে ‘যুদ্ধ পরিকল্পনা’ পর্যন্ত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলাফ্যাক্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে সফররত তুর্কি সংসদীয় প্রতিনিধিদলকে ‘আর্ট অব ট্রাইআমফ’ (Art of Triumph) নামক গ্রাফিতির একটি বই উপহার দেন। এই বইটি মূলত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে আঁকা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতির সংকলন।
বইটির প্রচ্ছদে শহীদ আবু সাইদ ও বাংলাদেশের মানচিত্রভিত্তিক একটি দেয়ালচিত্র আঁকা রয়েছে। এই গ্রাফিতিকে কেন্দ্র করেই ভারতের মূলধারার মিডিয়া যেমন ফিনানসিয়াল এক্সপ্রেস, ফার্স্ট পোস্ট, ইন্ডিয়া ডট কম ও এবিপি লাইভ মিথ্যা প্রতিবেদন প্রকাশ করে যে ড. ইউনূস তুর্কি কর্মকর্তাদের একটি ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ মানচিত্র উপহার দিয়েছেন। এমনকি, নিউজ এইটিন গ্রাফিতির বইটিকে 'ডকুমেন্ট' আখ্যা দিয়ে এর মধ্যে ‘যুদ্ধ পরিকল্পনা’ আছে বলেও ভিত্তিহীন দাবি করেছে।
বাংলাফ্যাক্ট নিশ্চিত করেছে, বইটির প্রচ্ছদে থাকা মানচিত্রের ছবিটি শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আঁকা একটি গ্রাফিতি চিত্র। এটি কোনো পেশাদার শিল্পী বা সরকারি উদ্যোগে আঁকা বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক মানচিত্র নয়, এবং চিত্রটিতে বাংলাদেশের বাইরে কোনো ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ভারতীয় গণমাধ্যমে এই প্রপাগান্ডা প্রথম শুরু হয় গত ১৫ অক্টোবর, যখন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস পাকিস্তানের যৌথ বাহিনীর চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সময়ও একই গ্রাফিতির প্রচ্ছদকে কেন্দ্র করে প্রচার করা হয় যে ড. ইউনূস নাকি পাকিস্তানি জেনারেলকে এমন একটি মানচিত্র উপহার দিয়েছেন, যেখানে বাংলাদেশের পতাকায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সংযুক্ত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ড. ইউনূস এর আগেও ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনে যোগ দিয়ে জো বাইডেন, বিল ক্লিন্টন ও জাস্টিন ট্রুডোর মতো বিশ্বনেতাদেরকে এই একই বইটি উপহার দিয়েছিলেন। এমনকি গত বছর ৯ ডিসেম্বর তিনি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির সাক্ষাতের সময়ও তাকে এই বইটি দেখান।
বাংলাফ্যাক্ট অনুসন্ধান করে জানিয়েছে, ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’-সংক্রান্ত প্রপাগান্ডা এবারই প্রথম নয়। এর আগে চলতি বছরের পহেলা বৈশাখে (১৪ এপ্রিল ২০২৫) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ (সিবিএস)’ কর্তৃক আয়োজিত একটি ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনীর ছবি নিয়েও ব্যাপক গুজব ছড়ানো হয়। সে সময় ভারতীয় গণমাধ্যম এটিকে ‘তুরস্ক-সমর্থিত গোষ্ঠীর’ গ্রেটার বাংলাদেশ মানচিত্র প্রচার বলে অপপ্রচার চালায়।
এই অপপ্রচার এতটাই তীব্র ছিল যে বিষয়টি গত ৩১ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় কংগ্রেস দলের সংসদ সদস্য রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা উত্থাপন করেন। জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বাংলাফ্যাক্টকে উদ্ধৃত করে লিখিত বিবৃতিতে জানান, যে মানচিত্রটি দেখানো হয়েছিল, তা ছিল প্রাচীন বাংলার সালতানাত (সুলতানাত)-এর সময়ের ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনীর অংশ, তথাকথিত ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’-এর মানচিত্র নয়।
বাংলাফ্যাক্ট এই ধারাবাহিক অপপ্রচারকে ভিত্তিহীন ও হাস্যকর আখ্যা দিয়েছে। ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং গণ-আন্দোলনের বিরুদ্ধে গুজব ও ভুয়া তথ্য প্রচারের হার গত বছর থেকে ভারতীয় গণমাধ্যম এবং ভারত থেকে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বৃদ্ধি পেয়েছে।