চলতি বছর পূজার আগে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাশিত পরিমাণ ইলিশ না পেয়ে হতাশ কলকাতাবাসী। ১২০০ মেট্রিক টনের অনুমতি থাকলেও রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১৪৪ মেট্রিক টন। ফলে বেড়েছে দাম, কমেছে উৎসবের আনন্দ।
চলতি বছর দুর্গাপূজার আগে বাংলাদেশের পদ্মার রুপালি ইলিশের স্বাদ পাওয়ার আশায় ছিল পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা। কিন্তু সেই আশা অনেকটাই অপূর্ণ থেকে গেছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ১২০০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দিলেও বাস্তবে ভারতে এসেছে মাত্র ১৪৪ মেট্রিক টন মাছ। এর মধ্যে ৩৯ মেট্রিক টন গেছে ত্রিপুরায়, আর বাকি অংশ পৌঁছেছে কলকাতার হাওড়ার পাইকারি মাছের বাজারে।
৫ অক্টোবর ইলিশ রপ্তানির নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে কোনো ইলিশ আসছে না। ফলে কলকাতার বাজারে পদ্মার ইলিশের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ক্রেতাদের হতাশা ও বাজারমূল্য দুটোই।
হাওড়ার ফিস ইমপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ জানান, বাংলাদেশ সরকার ১২০০ মেট্রিক টনের অনুমতি দিলেও মাছ কম ধরা পড়ায় এবং দাম বেশি হওয়ায় এত কম পরিমাণে ইলিশ এসেছে। তিনি বলেন, “এবার এত কম ইলিশ এসেছে যা আগের সব বছরের চেয়ে সবচেয়ে কম। গত বছর পূজার আগে ৫৭৭ মেট্রিক টন ইলিশ এসেছিল। এবার সেই সংখ্যাটা নেমে এসেছে ১৪৪ মেট্রিক টনে।
বাজারে ইলিশের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। কোথাও প্রতি কেজি ১৯০০ রুপি, আবার কোথাও ২০০০ থেকে ২২০০ রুপিতেও বিক্রি হচ্ছে। ফলে অনেকেই ইলিশ কেনা থেকে বিরত রয়েছেন।
বাংলাদেশে ইলিশ বেশি পরিমাণে ধরা পড়লে আমাদের কাছে দাম কমে যেত। সরবরাহ কম থাকলে চাহিদা বাড়ে, আর চাহিদা বাড়লে দাম তো অবশ্যই বেশি হবে। এবার সেই পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে মাছের যোগান শুরু থেকেই কম ছিল। ওখানকার ব্যবসায়ীরাও চেষ্টা করেছেন বেশি মাছ পাঠানোর, কিন্তু দেশের চাহিদা মেটানোর পরই রপ্তানি সম্ভব। আগে দেশের মানুষ খাবে, তারপরই বিদেশে পাঠানো হবে—এটাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের ইলিশ দুই বাংলার বাঙালির মধ্যে আবেগের সেতুবন্ধন তৈরি করে। এবার সেই সেতুবন্ধনে কিছুটা ভাটা পড়েছে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ—দুই জায়গাতেই দাম বেড়েছে, আর সরবরাহ কমেছে। তবুও তিনি আশা করছেন, আগামী বছর সবকিছু স্বাভাবিক হলে আবারও পদ্মার ইলিশের স্বাদ নিতে পারবে এপার বাংলার মানুষ।
কলকাতার বাজারে বাংলাদেশের ইলিশ না থাকলেও বিকল্প হিসেবে এসেছে গুজরাট ও মিয়ানমারের ইলিশ। বর্তমানে গুজরাটের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কিলো ৮০০-৯০০ রুপিতে, আর মিয়ানমারের ইলিশ ১ হাজার রুপিতে। তবে স্বাদ ও গন্ধের দিক থেকে বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের কোনো তুলনাই হয় না বলে জানিয়েছেন কলকাতার পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশের ইলিশের যে রস, গন্ধ ও মিষ্টত্ব—তা অন্য কোনো অঞ্চলের ইলিশে পাওয়া যায় না। তাই প্রতিবছর পূজার আগে গঙ্গাপাড়ের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে পদ্মার রুপালি ইলিশের জন্য। এবারের হতাশা তাই তাদের কাছে শুধু একটি খাদ্য নয়, বরং আবেগের অভাব।
শেষ পর্যন্ত যতই গুজরাট বা মিয়ানমারের ইলিশে বাজার ভরে উঠুক, কলকাতাবাসীর মনে একটাই কথা—“পদ্মার ইলিশের স্বাদই আলাদা।” আর তাই আগামী বছর পদ্মার সেই রুপালি ঝলক আবারও ফিরবে—এই আশাতেই দিন গুনছে দুই বাংলার বাঙালিরা।