গণভোট দেশে হয়েছিল কতবার, ফল ছিল কী | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গণভোট দেশে হয়েছিল কতবার, ফল ছিল কী

আই নিউজ বিডি ডেস্ক  avatar   
আই নিউজ বিডি ডেস্ক
গণভোট দেশে হয়েছিল কতবার, ফল ছিল কী
গণভোট দেশে হয়েছিল কতবার, ফল ছিল কী
ছবি: সংগৃহীত
Bangladesh has held only three referendums since independence. Now, amid constitutional reform debates, the nation revisits its history of public voting and political transformation.

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মাত্র তিনবার অনুষ্ঠিত হয়েছে গণভোট। এবার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগে আবারও আলোচনায় এসেছে এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। অতীতের গণভোটগুলো কবে, কেন এবং কী ফল হয়েছিল—তা নিয়েই বিস্তারিত বিশ্লেষণ।

স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্র ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে গণভোট বারবার আলোচনায় এসেছে। জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় গণভোট, যা কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। সাধারণত সংবিধান সংশোধন, রাজনৈতিক সংকট নিরসন কিংবা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের মতো বিষয়েই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। তৎকালীন সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তখন তাঁর নীতি ও কর্মসূচির প্রতি জনগণের আস্থা যাচাই করতে গণভোটের আয়োজন করেন। সরকারি হিসেবে, মোট ভোটার ছিল প্রায় ৩ কোটি ৮৪ লাখ। ভোট পড়ে ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ। এর মধ্যে বিপুল সংখ্যক—৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে জিয়াউর রহমানের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন। এ ভোটের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নিজের অবস্থানকে বৈধতা দেন।

দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ, সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে। তখনও জনগণের আস্থা যাচাইয়ের উদ্দেশ্য ছিল প্রধান। ভোটে অংশগ্রহণের হার ছিল ৭২ দশমিক ২ শতাংশ, যার মধ্যে ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন এরশাদের পক্ষে। যদিও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তবুও প্রশাসনিকভাবে এটি দেশের দ্বিতীয় বড় গণভোট হিসেবে ইতিহাসে স্থান পায়।

এরপর দীর্ঘ বিরতির পর তৃতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদের পতনের পর দেশে আবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার বিষয়ে জনগণের মতামত নিতে এই গণভোট আয়োজন করে। ভোট পড়ে ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ; এর মধ্যে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোটার সংসদীয় শাসনব্যবস্থার পক্ষে ভোট দেন। ফলাফল স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, জনগণ সংসদীয় গণতন্ত্রকেই বেছে নিয়েছিল।

এরপর প্রায় দুই দশক কেটে যায় গণভোটবিহীন। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের ধারা বাতিল করা হয়। তবে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর আদালতের রায়ে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হয়। এই রায় অনুযায়ী, জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক পথ আবারও খুলে যায়।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ায় আবারও গণভোট নিয়ে উত্তপ্ত হয়েছে দেশের রাজনীতি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, রাজনৈতিক দলগুলো ও নাগরিক সমাজের মধ্যে আলোচনা চলছে—গণভোট কি সংসদ নির্বাচনের আগে হবে, নাকি নির্বাচনের সঙ্গে একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে। জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু দল নির্বাচন-পূর্ব গণভোটের দাবি তুলেছে, অন্যদিকে বিএনপি ও কয়েকটি দল একযোগে আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামতও ভিন্ন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও গবেষক ড. নিজাম উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট করা অযৌক্তিক, কারণ এতে সময় ও ব্যয় দুই-ই বাড়বে। তাঁর মতে, এ ধরনের জাতীয় ভোট আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক সক্ষমতা সীমিত। গণভোট করতে হলে পুরো দেশে ব্যালট পেপার ছাপানো, প্রিসাইডিং অফিসার নিয়োগ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার—সব মিলিয়ে বিপুল অর্থব্যয় হবে।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শ ম আলী রেজা বিশ্বাস করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে দলগুলো চাইলেই গণভোটের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে। তিনি বলেন, জনগণকে গণভোটের প্রক্রিয়া ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। প্রয়োজনে এটি আগামী নির্বাচিত সরকারের অধীনেও সম্পন্ন করা যেতে পারে, যদি সব দল একমত হয়।

গণভোট এখন কেবল একটি রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে। সংবিধান সংস্কার, নির্বাচনের সময়সূচি, ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান—সব কিছুই এখন এই এক প্রশ্নে এসে ঠেকেছে: জনগণের হাতে কি আবারও ফিরছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা?

বাংলাদেশের ইতিহাসে অনুষ্ঠিত তিনটি গণভোট যেমন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মোড় ঘুরিয়েছে, তেমনি আসন্ন গণভোট নিয়েও জেগে উঠেছে নতুন প্রত্যাশা ও সংশয়।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator