জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ত্বরান্বিত করতে মাত্র এক বছরে চারবার সংশোধন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন। এতে অভিযুক্তদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্যতা থেকে শুরু করে ভার্চুয়াল শুনানির সুযোগ—সবই যুক্ত হয়েছে নতুন আইনে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি করেছে তীব্র আলোড়ন।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে এক বছরের ব্যবধানে চারবার পরিবর্তন আনা হয়েছে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে। অন্তর্বর্তী সরকার দাবি করছে, এসব সংশোধনী সময়োপযোগী ও বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুততর করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এত অল্প সময়ে চারবার আইন সংশোধন বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
প্রথম সংশোধনী আসে গত বছরের ২৪ নভেম্বর। আগে ট্রাইব্যুনাল কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সংঘটিত অপরাধের বিচার করতে পারত। নতুন সংশোধনীতে বাংলাদেশের বাইরে সংঘটিত অপরাধকেও এই ট্রাইব্যুনালের আওতায় আনা হয়। একই সঙ্গে আরও কয়েকটি বড় পরিবর্তন যুক্ত হয়—যেমন কোনো দেশের নাগরিক বাংলাদেশের ভেতরে মানবতাবিরোধী অপরাধ করলে তার বিচার করা যাবে; সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও বিচার করা সম্ভব হবে; এমনকি জোরপূর্বক গর্ভধারণ, যৌনদাসী বা গুমের মতো অপরাধকেও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ধরা হবে। এছাড়া তদন্ত কর্মকর্তাদের তল্লাশি ও জব্দের ক্ষমতা বাড়ানো হয়, এবং ভার্চুয়াল শুনানির সুযোগও সংযোজন করা হয়।
দ্বিতীয় সংশোধনী আসে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি। “আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫” নামে প্রকাশিত এই আইনে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় ছয় সপ্তাহ থেকে কমিয়ে তিন সপ্তাহ করা হয়, যাতে বিচার দ্রুত শেষ করা যায়। এই সংশোধনীতে ট্রাইব্যুনালকে আরও ক্ষমতা দেওয়া হয়—যেমন ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দিতে অভিযুক্তের সম্পদ জব্দ করা, বিদেশে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, এমনকি তল্লাশির জন্য আলাদা অনুমতির প্রয়োজন না হওয়া।
তৃতীয় সংশোধনী আসে ১০ মে, যাতে রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগোষ্ঠীকেও বিচারের আওতায় আনার বিধান যোগ করা হয়। এটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ, কারণ এর আগে এমন কোনো সুযোগ ছিল না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংশোধনী ভবিষ্যতের ক্ষমতার সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
চতুর্থ ও সবচেয়ে আলোচিত সংশোধনীটি আসে ৬ অক্টোবর রাতে। এর মাধ্যমে ১৯৭৩ সালের আইনে নতুন ধারা ২০ (সি) যোগ করা হয়, যেখানে বলা হয়—যার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গৃহীত হবে, তিনি নির্বাচন করার অযোগ্য হবেন এবং জনপ্রতিনিধি থাকলে তার পদ হারাবেন। এই ধারা কার্যকর হতেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হয়ে পড়েন।
আইনের এই সংশোধন ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা পেয়েছে, অর্থাৎ এটি পেছনের ঘটনাতেও প্রযোজ্য হবে। আইনি ভাষায়, এটি একটি “retroactive provision”—যা সাধারণত বিরল ও বিতর্কিত পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয়।
গেজেট অনুসারে, যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হলে তিনি সংসদ সদস্য, মেয়র, চেয়ারম্যান, কমিশনার বা কোনো সরকারি পদে মনোনয়ন বা নিয়োগ পাওয়ার অযোগ্য হবেন। তবে ট্রাইব্যুনাল যদি কাউকে খালাস বা অব্যাহতি দেয়, তার ক্ষেত্রে এসব বিধান প্রযোজ্য হবে না।
উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এই আইন প্রণয়ন করেছিল এবং ২০১০ সালে সেটির আওতায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। সেই আইনেই ১৪ বছর ধরে বিচার চলেছে। কিন্তু গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার একই ট্রাইব্যুনাল ব্যবহার করে নতুন করে বিচার শুরু করে।
আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল গত বছর ১৪ আগস্ট এক বক্তব্যে জানান, “জুলাই গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় হবে। ১৯৭৩ সালের আইনটি ইতিমধ্যে ২০০৯ ও ২০১৩ সালে সংশোধিত হয়েছে, এবার সেটিকেই পুনরায় আধুনিকায়ন করা হচ্ছে।”
আইনের ধারাবাহিক এই পরিবর্তন এখন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও বিচারব্যবস্থায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। অনেকেই মনে করছেন, এসব সংশোধনী কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কাঠামো বদলাচ্ছে না—বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রও পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।