ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যস্থতা করায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার দাবি তুলেছেন ইসরায়েলের বিরোধী নেতা ইয়ায়ির লাপিদ। যুদ্ধবিরতির খবরে গাজা জুড়ে আনন্দের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদনের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ায়ির লাপিদ। বৃহস্পতিবার ট্রাম্প নিজেই ঘোষণা দেন যে, উভয় পক্ষ তাঁর প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
এই ঘোষণা আসার পরপরই লাপিদ এক বিবৃতিতে বলেন, “বর্তমানে অন্য যে কারও চেয়ে ট্রাম্প নোবেল পুরস্কারের সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য। তিনি ইসরায়েলিদের কৃতজ্ঞতা অর্জন করেছেন।” লাপিদ আরও বলেন, “আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল, তাঁর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার, মার্কো রুবিও, টনি ব্লেয়ার এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুসহ সবার প্রতি অভিনন্দন জানাই। বিশেষ করে সেই সব জিম্মিদের পরিবারকে ধন্যবাদ, যারা কখনোই তাদের প্রিয়জনদের ভুলে যেতে দেয়নি।”
ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগও তাঁর প্রশংসা করে বলেন, “এই যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতায় ট্রাম্প যে ভূমিকা রেখেছেন, তাতে তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।”
ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প গাজায় যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত একটি নতুন প্রস্তাব ঘোষণা করেন। ইসরায়েল, মিসর ও কাতার তাৎক্ষণিকভাবে এতে সম্মতি জানালেও হামাস তখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। পরবর্তীতে ৩ অক্টোবর হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি দিলে ৪ অক্টোবর ট্রাম্প ইসরায়েলকে গাজায় হামলা বন্ধের আহ্বান জানান।
এরপর মিসরের পর্যটন নগরী শারম আল শেখে যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাতার, ইসরায়েল ও হামাসের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার আয়োজন হয়। দুই দিনেরও বেশি সময় ধরে আলোচনার পর উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক বাস্তবায়ন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এই পর্যায়টির মেয়াদ ৬ সপ্তাহ। এই সময়ের মধ্যে হামাস তার হাতে থাকা সব জিম্মিকে মুক্তি দেবে, এর বিনিময়ে ইসরায়েল সামরিক অভিযান বন্ধ করবে এবং ধীরে ধীরে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের খবর প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজার রাস্তায় উৎসবের জোয়ার বইতে শুরু করে। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসে মানুষ আনন্দ মিছিল বের করে, তরুণরা নেচে-গেয়ে, বাঁশি ও খঞ্জনি বাজিয়ে উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে।
গাজার বাসিন্দা পাঁচ সন্তানের মা ঘাদা বলেন, “আমি কাঁদছি, কিন্তু এটা আনন্দের অশ্রু। মনে হচ্ছে আমরা নতুন করে জন্ম নিয়েছি। আশা করছি, এই ভয়াবহ যুদ্ধ অবশেষে শেষ হতে যাচ্ছে।” ঘাদা জানান, ইসরায়েলি বাহিনীর বোমায় তাদের বাড়ি ধ্বংস হওয়ার পর ১৫ মাস ধরে তাঁবুতে জীবনযাপন করছেন তিনি ও তাঁর পরিবার।
এদিকে খান ইউনিসের দেইর আল-বালাহ এলাকায় আশ্রয় নেওয়া আহমেদ দাহমান বলেন, “অবশেষে গাজায় রক্তপাত বন্ধ হচ্ছে—এটা আনন্দের খবর। তবে আমরা যখন ফিরে যাব, তখন দেখব কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।” তিনি আরও বলেন, “বাবার দেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে রেখেই পালাতে হয়েছিল। এখন ফিরেই তাঁর দাফন সম্পন্ন করাই আমার প্রথম কাজ হবে।”
আহমেদের মা বুশরা বলেন, “এই যুদ্ধবিরতি আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না, কিন্তু অন্তত অনেকের জীবন রক্ষা পাবে। আমি কাঁদব, কারণ এই নিষ্ঠুর যুদ্ধ আমাদের কাঁদার সময়ও দেয়নি।”
এই যুদ্ধবিরতি শুধু রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং গাজার মানুষের কাছে এটি এক নতুন আশার সূচনা। দীর্ঘ দুঃসহ যুদ্ধের পর রক্ত ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও শান্তির প্রথম আলো দেখছেন তারা। ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এই চুক্তি বিশ্বের সামনে এক বিরল কূটনৈতিক সাফল্যের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।