ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব ‘সুক্কোট’ উপলক্ষে ইসরায়েল হঠাৎ করেই ফিলিস্তিনের হেবরনে অবস্থিত ঐতিহাসিক ইব্রাহিমি মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছে। মুসলমানদের অন্যতম পবিত্র এই স্থানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করায় ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয়রা, বাড়ানো হয়েছে কারফিউ ও সেনা টহল।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব ‘সুক্কোট’ উপলক্ষে বুধবার সকালে ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীরের হেবরন শহরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ইব্রাহিমি মসজিদ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। মসজিদে যাওয়ার সকল রাস্তা ও প্রবেশপথ ইসরায়েলি সেনারা অবরোধ করে রাখে, ফলে স্থানীয় মুসল্লিরা নামাজ আদায় বা পবিত্র স্থানে প্রবেশ করতে পারেননি।
ইব্রাহিমি মসজিদ মুসলমানদের কাছে একটি অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন স্থান। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, এখানেই সমাধিস্থ আছেন নবী হজরত ইব্রাহিম (আ.), ইসহাক (আ.), ইয়াকুব (আ.), ইউসুফ (আ.) এবং তাঁদের স্ত্রীগণ। এই মসজিদ শুধু ধর্মীয় দিক থেকে নয়, বরং ইসলামি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক গভীর প্রতীক।
ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, মসজিদটি বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত সাধারণ মুসল্লিদের জন্য বন্ধ থাকবে। এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন হেবরনের আল-আওকাফ বিভাগের পরিচালক আমজাদ কারাজেহ। তিনি বলেন, “ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকারে সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং একটি পবিত্র স্থানকে অবমাননার স্পষ্ট উদাহরণ।”
এদিকে, ইসরায়েলি সেনারা শুধু মসজিদেই নয়, হেবরনের আশপাশের এলাকাতেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। মসজিদের চারপাশে সামরিক চেকপয়েন্ট স্থাপন করা হয়েছে এবং কয়েকটি এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না, এমনকি শিক্ষার্থীরাও স্কুলে যেতে পারছেন না। শহরজুড়ে এক প্রকার অঘোষিত অবরুদ্ধ অবস্থা বিরাজ করছে।
এই ঘটনায় মুসলিম বিশ্বে গভীর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি এমন অবমাননা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন ইসলামি সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থা। তারা বলছে, ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয় স্থানগুলোকে দখল ও নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন ইসরায়েলের উগ্রপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গিভির নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, “আল-আকসার মালিক এখন ইসরায়েল।” তাঁর এই উস্কানিমূলক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানায় সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যারা একে “ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়ানোর পরিকল্পিত প্রচেষ্টা” বলে অভিহিত করেছে।
ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইব্রাহিমি মসজিদে এই ধরনের বন্ধ ঘোষণা শুধু ধর্মীয় স্বাধীনতাকেই খর্ব করে না, বরং এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও জাতিসংঘের প্রস্তাবনার সরাসরি লঙ্ঘন। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন ইসরায়েলের এই আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েল এই ধরণের পদক্ষেপের মাধ্যমে পশ্চিমতীরে নিজেদের আধিপত্য আরও দৃঢ় করতে চায়। মুসলিম পবিত্র স্থানে প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিয়ে তারা ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয় চেতনা ও প্রতিরোধ মনোভাব দুর্বল করার কৌশল নিচ্ছে।
তবে ফিলিস্তিনিরা বলছেন, তারা কোনোভাবেই নিজেদের ঐতিহ্য, ধর্মীয় অধিকার ও পবিত্র স্থান থেকে সরে দাঁড়াবে না। ইব্রাহিমি মসজিদ মুসলমানদের গর্ব ও আত্মপরিচয়ের অংশ, যা কোনো সামরিক দখলে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।