গাজার অবরোধ ভাঙতে যাত্রা করা আন্তর্জাতিক নৌবহর ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’র সব জাহাজ আটক করেছে ইসরায়েল। নৌবহরে থাকা বাংলাদেশের আলোকচিত্রী শহিদুল আলমসহ সব যাত্রীকে বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।
গাজায় অবৈধ নৌ অবরোধ ভাঙার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা আন্তর্জাতিক নৌবহর ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’ এখন ইসরায়েলি নৌবাহিনীর হাতে আটক। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, গাজার উদ্দেশে যাত্রা করা এই নৌবহরের সব জাহাজ থামিয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। আটক হওয়া নৌযানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশি আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে বহনকারী ‘কনসেন্স’ নামের জাহাজটিও।
ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (X)-এ এক পোস্টে জানায়—“আইনসিদ্ধ নৌ অবরোধ ভাঙার আরেকটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা শেষ হলো। নৌযান ও যাত্রীদের ইসরায়েলি বন্দরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সকল যাত্রী নিরাপদ ও সুস্থ আছেন, তাদের দ্রুত নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।”
এর আগে শহিদুল আলম তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দুটি ভিডিও শেয়ার করেন। একটিতে তিনি লেখেন, “ইসরায়েলিরা কনসেন্সের দিকে অগ্রসর হচ্ছে,” আরেকটিতে উল্লেখ করেন, “ইসরায়েলিরা অগ্রসর হচ্ছে।” তাঁর এই পোস্টগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে, ইসরায়েলি বাহিনী ইতোমধ্যেই ফ্রিডম ফ্লোটিলাকে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নিচ্ছিল।
ফ্রিডম ফ্লোটিলা হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক মানবিক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য গাজায় ইসরায়েলি অবরোধ ভেঙে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো। তবে ইসরায়েল এই উদ্যোগকে “নিরাপত্তা হুমকি” বলে দাবি করে প্রতিবারই নৌযানগুলোকে আটক করে। এবারের অভিযানটি ছিল বিশেষভাবে আলোচিত, কারণ এতে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও শান্তিকর্মীরা।
শুধু এই অভিযানে নয়—এক সপ্তাহ আগেও ইসরায়েলি নৌবাহিনী ‘সুমুদ ফ্লোটিলা’ নামের আরেকটি বহরে অভিযান চালিয়ে অন্তত ৪০টি নৌযান আটক করেছিল। সেই অভিযানে থাকা ৪৭৯ জন যাত্রীর মধ্যে বহুজনকে আটক ও নির্যাতন করা হয়, পরে তাদের তুরস্ক, গ্রিস ও স্লোভেনিয়ায় পাঠানো হয়। সেই অভিযানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত সুইডিশ জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ-ও।
অন্যদিকে, গাজা ফ্রিডম ফ্লোটিলা সংগঠনটি তাদের সর্বশেষ আপডেটে জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনারা তাদের একাধিক নৌযানে প্রবেশ করেছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। সংগঠনটির ইনস্টাগ্রাম পোস্টে বলা হয়—“আমাদের সংকেত বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে, তবুও আমরা প্রতিরোধ করছি। অন্তত দুটি নৌযানে ইসরায়েলি বাহিনী প্রবেশ করেছে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অভিযানের মাধ্যমে ইসরায়েল আবারও বিশ্বকে বার্তা দিতে চায় যে, গাজায় তার আরোপিত অবরোধ ভাঙার যে কোনো প্রচেষ্টা ‘আইনবিরুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এটি গাজাবাসীর প্রতি আরেকটি নিষ্ঠুর বার্তা—যে তারা এখনো মুক্ত নয়, এমনকি মানবিক সহায়তার পথও তাদের জন্য বন্ধ।
এদিকে আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের নিন্দা জানানো শুরু হয়েছে। বহু মানবাধিকার সংগঠন ও শান্তিকর্মী একে “আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন” বলে অভিহিত করেছেন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে তদন্তের দাবি তুলেছে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও বিশ্ববাসী দেখল—গাজা উপত্যকার মুক্তির সংগ্রাম কতটা কঠিন, আর মানবিক সহায়তার প্রচেষ্টাও কীভাবে সামরিক শক্তির মুখে বারবার ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। শহিদুল আলমের মতো মানবাধিকারকর্মীরা আবারও প্রমাণ করলেন—বিপদের মুখেও সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াই কখনও থেমে থাকে না।