দেশের বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত করতে সরকার সম্প্রতি এয়ার গার্ড অব বাংলাদেশ (এজিবি) বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বিশেষ বাহিনী দেশের সব বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধ করবে, যাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নিরাপদ থাকে।
সুপারিশ প্রণয়নের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা ১২ সদস্যের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আতাউর রহমান খান। এই কমিটিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধি রাখা হয়েছে, যারা বিশেষ বাহিনী গঠনের বিস্তারিত প্রস্তাবনা প্রস্তুত করবেন।
সূত্র জানিয়েছে, দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তার জন্য বিমান বাহিনী, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), আনসার ও বেবিচকের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করলেও একাধিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে দ্বন্দ্বের ঘটনা ঘটেছে। নতুন এজিবি বাহিনী এই সমন্বয় সমস্যার সমাধান করবে।
নতুন বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিটি সদস্য একটি নির্দিষ্ট অর্গানোগ্রামের অধীনে দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের যানবাহন এবং অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্টও একটি কাঠামোর আওতায় থাকবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করবে, যা বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তায় ‘চেইন অফ কমান্ড’ প্রতিষ্ঠা করবে।
১৯৮৫ সাল থেকে দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল পরিচালনা করছে বেবিচক। এর আগে এই সংস্থা বিএএসএফ নামে একটি নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে, কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতি উদ্বেগের কারণে সেই পরিকল্পনা স্থগিত হয়। এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে এজিবি বাহিনী গঠনের মাধ্যমে এই উদ্যোগ পুনরায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মফিদুর রহমান বলেন, “নতুন উদ্যোগ ইতিবাচক, তবে সিভিল অ্যাভিয়েশনের প্রতিনিধিরাও কমিটিতে থাকা উচিত। আইকাওয়ের মানদণ্ড মেনে চলা আবশ্যক।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি বলেন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী এয়ার গার্ড গঠন সময়ের দাবি। প্রাথমিকভাবে বাহিনী হিসেবে কাজ শুরু করবে, পরে অধিদপ্তরে রূপান্তরিত হবে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রধান আতাউর রহমান খান জানান, “কেবলমাত্র শুরু হয়েছে, তবে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদার করতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।”
দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বর্তমানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। হঠাৎ ঘটতে থাকা বিভিন্ন অপরাধ যেমন সোনা ও বৈদেশিক মুদ্রা পাচার, চুরি এবং অন্যান্য বেআইনি কার্যক্রম বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০,০০০ যাত্রী আসে দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক ও পাঁচটি আঞ্চলিক বিমানবন্দরে। কিন্তু নিরাপত্তার ঘাটতি অপরাধীদের সহজ সুযোগ দিচ্ছে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এভসেক বাহিনী প্রায় ৫,০০০ জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াধীন। তবে দীর্ঘমেয়াদে বিমানবন্দর নিরাপত্তা জোরদারের জন্য এজিবি বাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অবশ্য, বেবিচকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বাহিনী গঠনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা মনে করেন, যেখানে ইতিমধ্যেই এভসেক, বিমান বাহিনী ও এপিবিএন কাজ করছে, সেখানে নতুন বাহিনী গঠনের প্রয়োজন নেই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আশা করছে, নতুন এজিবি বাহিনী দেশের বিমানবন্দরগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা প্রদানের পাশাপাশি যাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করবে।