মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার এক নাটকীয় দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলি হামলার জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে দিয়ে কাতারের কাছে ক্ষমা চাইয়েছেন তিনি। এরপর ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত অবসানে একটি ২০-দফা শান্তি পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছেন, যার মূল লক্ষ্য গাজায় ‘স্থায়ী শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এই ‘শান্তি পরিকল্পনা’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই ‘সৌদে’র আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র আসলে গাজাকে সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে এনে সেখানে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
এই নাটকীয় ঘটনাটির সূত্রপাত ঘটেছিল যখন ইসরায়েল দোহায় হামাস নেতাদের ওপর বিমান হামলা চালায়, যেখানে কাতারের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ পাঁচজন হামাস সদস্য নিহত হন। এই হামলার পর মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো ট্রাম্পের কাছে ইসরায়েলকে থামানোর জন্য অনুরোধ করে। ট্রাম্প এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহুকে দিয়ে কাতারের কাছে ক্ষমা চাইয়েছেন এবং এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সকল দেশকে ‘এহসানের’ জালে আবদ্ধ করেছেন। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এই ‘সৌদে’র আসল লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রাম্পের এই পরিকল্পনাকে তারা ‘মুনাব্বিহ’ চাল হিসেবে দেখছেন, যেখানে মূল লক্ষ্য হাসিল করার জন্য একটি অপ্রয়োজনীয় ঘটনার জন্ম দেওয়া হয়।
ট্রাম্পের এই শান্তি পরিকল্পনার মূল বিষয়গুলো শুনলেই স্পষ্ট হয় এর আসল উদ্দেশ্য কী। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে:
-
গাজায় যুদ্ধ বন্ধ হবে এবং সকল জিম্মিকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি দিতে হবে।
-
গাজাকে ‘সন্ত্রাসমুক্ত’ করা হবে এবং হামাসের সকল ঘাঁটি ও অস্ত্র ধ্বংস করা হবে।
-
হামাসকে গাজার প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।
-
গাজার শাসনভার পরিচালনার জন্য ট্রাম্পের সভাপতিত্বে একটি ‘অস্থায়ী বোর্ড’ গঠন করা হবে, যেখানে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
-
গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি ‘আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী’ মোতায়েন করা হবে, যারা গাজার পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেবে।
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে। সমালোচকরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে ট্রাম্প আসলে সম্পূর্ণ গাজা উপত্যকাকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে এনে ইসরায়েলের হাতে তুলে দিতে চাইছেন। তারা বলছেন, এই ‘অস্থায়ী বোর্ড’ আসলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি দীর্ঘমেয়াদী শাসন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। ট্রাম্পের উদ্দেশ্য হলো গাজাকে চীনের হংকং বা ম্যাকাওয়ের মতো একটি ‘বিশ্বমানের বাণিজ্যিক শহরে’ রূপান্তর করা, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে দুবাই এবং কাতারের দোহা’র মতো শহরগুলো যখন বিশ্বের নতুন বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত বিকাশ লাভ করছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাজাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে তাদের বাণিজ্যিক আধিপত্যকে প্রসারিত করতে চায়। ট্রাম্পের এই পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, গাজাকে ‘বিশেষ বাণিজ্যিক অঞ্চল’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে এবং মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনাটি মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর ওপর এক বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। মুসলিম দেশগুলো যখন কাতারকে সমর্থন জানিয়েছিল, তখন তাদের এখন ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা মেনে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই বলেছেন, যদি হামাস এই পরিকল্পনা না মানে, তবে ইসরায়েল আরও কঠোরভাবে গাজাকে ‘পরিষ্কার’ করবে, সহজ বা কঠিন—যেভাবেই হোক।
হিলশা ফল (Hilsa Fall), যা শান্তি পরিকল্পনার একটি রূপক, তার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার ফলে গাজার জনগণ তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার হারাবে এবং ইসরায়েলের স্থায়ী দখলদারিত্বের মুখে পড়বে।
সার্বিকভাবে, ট্রাম্পের এই ‘শান্তি পরিকল্পনা’ শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি করা হচ্ছে, তখন অন্যদিকে এর আড়ালে ক্ষমতার দখল, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক গভীর কৌশল লুকিয়ে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পরিকল্পনার ফলে গাজার জনগণের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া এক নতুন ও জটিল মোড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।