গাজায় প্রায় দুই বছরের রক্তক্ষয়ী গণহত্যার পর অবশেষে কি শান্তির আভাস মিলছে? যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের ভূমিকায় নতুন আলোচনার পথ খুলছে।
গাজায় প্রায় দুই বছর ধরে অব্যাহত রক্তপাত, ধ্বংসযজ্ঞ ও ফিলিস্তিনি গণহত্যা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। প্রতিদিনের মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞে মানুষ যখন প্রশ্ন তুলছে—আসলে শান্তির কোনো বাস্তব সম্ভাবনা আছে কি না—তখন হঠাৎ করেই এক ঝলক ক্ষীণ আশার আলো সামনে এসেছে। তবে এই আলো কতটা স্থায়ী হবে, আর কতটা কূটনৈতিক ভাঁওতাবাজি, সেটিই এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আগেও গাজার শান্তি নিয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন। কিন্তু সেসব আশাবাদ বাস্তবে কখনো রূপ নেয়নি। এবারও তাঁরা দাবি করেছেন, গাজার শান্তি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কাছাকাছি। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—আগের মতো এবারও কি তা কেবল মরীচিকা হয়ে যাবে, নাকি সত্যিই ইতিহাসের মোড় ঘুরবে?
দুটি বড় ঘটনা পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নিয়ে গেছে।
প্রথম ঘটনাটি ঘটেছে কাতারে হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে। যদিও হামাস নেতারা নিহত হননি, তবে ঘটনাটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আলোড়ন তোলে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, যারা কাতারের আকাশ প্রতিরক্ষার দায়িত্বে আছে এবং যাদের বিশাল সামরিক ঘাঁটি সেখানে, তারা এই হামলার বিষয়ে কিছু জানত না—এটি বিশ্বাস করা কঠিন। বরং ব্যর্থ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র দায় এড়াতে চাইছে বলেই অনেকের ধারণা। যুক্তরাষ্ট্র যদিও কাতারের ওপর হামলার নিন্দা করেছে, কিন্তু একইসঙ্গে ইসরায়েলের “শত্রুদের যেকোনো জায়গায় টার্গেট করার অধিকার” আছে বলেও মন্তব্য করেছে। এই দ্বৈত অবস্থান আরব বিশ্বকে স্পষ্ট করে দিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তার ঢাল নয়, বরং তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই কাজ করে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে।
দ্বিতীয় বড় ঘটনা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ পশ্চিমা মিত্রদের একটি বড় অংশ অবশেষে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর এই স্বীকৃতি কেবল কূটনৈতিক বার্তা নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির পালাবদলের ইঙ্গিত। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ইঙ্গিত দিয়েছে। এটি ইসরায়েলের জন্য বড় কূটনৈতিক চাপ তৈরি করছে এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে। সেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিসর, জর্ডান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকের পরই মধ্যস্থতাকারী স্টিভ উইটকফ ও অন্যান্য সূত্র যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময়ের বিষয়ে নতুন করে আশাবাদ ব্যক্ত করতে শুরু করে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই বন্দিবিনিময় সমতাভিত্তিক নয়। ইসরায়েলের হাতে হাজারো ফিলিস্তিনি বন্দী রয়েছে, আর হামাসের হাতে তুলনামূলক অল্প সংখ্যক বন্দী। তাই “বন্দিবিনিময়” শব্দটি ব্যবহার হলেও এটি মূলত অসম এক প্রক্রিয়া।
তবুও এই সবকিছু মিলিয়ে নতুন আলোচনার পথ খোলার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আরব বিশ্বের হতাশা, পশ্চিমা শক্তির পালাবদল, এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ—সব মিলিয়ে গাজায় দীর্ঘ রক্তক্ষয়ের পর হয়তো প্রথমবারের মতো শান্তির সম্ভাবনা একটু হলেও দৃশ্যমান হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন এখনো থেকে যায়—এই আলো কতটা টেকসই? ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব বিশ্ব তাদের নিজ নিজ স্বার্থের বাইরে গিয়ে কি সত্যিই মানবতার জন্য এগিয়ে আসবে? নাকি আগের মতোই এই ক্ষীণ আশা আবারও নিভে যাবে? গাজার অসংখ্য মৃত শিশু, বিধ্বস্ত পরিবার এবং শোকাহত জাতি এখন সেই উত্তর খুঁজছে।