অনলাইনে পণ্য বিক্রি: আস্থার সংকট ও প্রতারণার ফাঁদ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অনলাইনে পণ্য বিক্রি: আস্থার সংকট ও প্রতারণার ফাঁদ

Mohammad Monty avatar   
Mohammad Monty
অনলাইনে পণ্য বিক্রি: আস্থার সংকট ও প্রতারণার ফাঁদ
অনলাইনে পণ্য বিক্রি: আস্থার সংকট ও প্রতারণার ফাঁদ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে অনলাইনে পণ্য বিক্রি করে ক্রেতাদের প্রতারিত করে যাচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু অনলাইন প্লাটফর্ম।..

​ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে আমাদের অগ্রযাত্রা যখন গতিশীল, তখন এর অন্যতম চালিকাশক্তি ই-কমার্স (e-commerce) বা অনলাইন কেনাকাটা দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও সময় বাঁচানোর তাগিদে নিত্যপ্রয়োজনীয় থেকে শুরু করে বিলাসবহুল পণ্য—সবই এখন মানুষ ঘরে বসে অনলাইনে অর্ডার করছে। তবে এই সুবিধার আড়ালে ডালপালা বিস্তার করেছে এক শ্রেণির অসাধু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যারা ক্রেতাদের ঠকিয়ে চলেছে এবং পুরো ই-কমার্স খাতের ওপরই আস্থার সংকট সৃষ্টি করছে।

​প্রতারণার কৌশল: ক্রেতাকে কীভাবে ঠকানো হচ্ছে?

​এই অসাধু ব্যবসায়ীরা নানা চটকদার কৌশল ব্যবহার করে সাধারণ ক্রেতাদের প্রতারিত করে। তাদের প্রতারণার ধরনগুলো প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে দেখা যায়:

​১. পণ্য প্রদর্শন ও সরবরাহে গরমিল:

  • ​বিজ্ঞাপনে এক, বাস্তবে অন্য: অনলাইনে পণ্যের যে ছবি বা বিবরণ দেওয়া হয়, তা থাকে উন্নত মানের, কিন্তু ডেলিভারির সময় ক্রেতার হাতে পৌঁছায় সম্পূর্ণ নিম্নমানের বা ভুল পণ্য। এটি ই-কমার্স প্রতারণার সবচেয়ে সাধারণ কৌশল।
  • ​'নকল'কে 'আসল' বলে চালিয়ে দেওয়া: বিশেষত ব্র্যান্ডেড পোশাক, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বা প্রসাধনীর ক্ষেত্রে নামী ব্র্যান্ডের হুবহু নকল পণ্যকে আসল দামে বিক্রি করা হয়।

​২. অগ্রিম অর্থ নিয়ে উধাও:

  • ​'ফ্ল্যাশ সেল' বা 'অতি লোভনীয় অফার': অনেক অসাধু পেজ বা ওয়েবসাইট অবিশ্বাস্য কম দামে পণ্য বিক্রির লোভ দেখিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম মূল্য (Advance Payment) নিয়ে নেয়। এরপর ক্রেতাদের সাথে সকল যোগাযোগ বন্ধ করে সেই টাকা আত্মসাৎ করে।
  • ​নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ না করা: অনেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে মাসের পর মাস পণ্য ডেলিভারি করে না এবং নানা অজুহাত দেখিয়ে সময় পার করতে থাকে।

​৩. ভুয়া পেজ ও দুর্বল প্ল্যাটফর্ম:

  • ​ফেক রিভিউ: কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের পেজ বা ওয়েবসাইটে নিজেদের পক্ষে ভুয়া ইতিবাচক রিভিউ (Fake Reviews) ব্যবহার করে ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে।
  • ​স্বল্পস্থায়ী ওয়েবসাইট: দ্রুত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয় নামসর্বস্ব ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজ, যা কিছুদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়।

​কেন এই প্রতারণা?

​অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর এই লাগামহীন প্রতারণার পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:

  • ​স্বচ্ছতার অভাব: অনেক অনলাইন বিক্রেতার ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি (DBID) বা ট্রেড লাইসেন্স নেই, ফলে তাদের চিহ্নিত করা কঠিন।
  • ​নিয়ন্ত্রণের শিথিলতা: ই-কমার্স খাতের জন্য আইন থাকলেও অনেক ছোট ও সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক ব্যবসার ওপর এর সঠিক নজরদারি ও প্রয়োগের অভাব রয়েছে।
  • ​আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতা: বহু ক্রেতা প্রতারিত হলেও আইনি প্রতিকার পাওয়ার সঠিক পথ ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত নন।

​ক্রেতার সুরক্ষায় করণীয় কী?

​প্রতারণার এই জাল থেকে বাঁচতে ক্রেতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উভয়কেই পদক্ষেপ নিতে হবে।

​১. ক্রেতার সতর্কতা (Buyer's Caution):

* যে কোনো পণ্য কেনার আগে বিক্রেতার পেজের রিভিউ, রেটিং ও ফলোয়ার সংখ্যা ভালো করে যাচাই করুন।

* অবিশ্বাস্য কম দামের 'ফ্ল্যাশ সেল' বা অফার থেকে দূরে থাকুন।

* ক্যাশ অন ডেলিভারি (COD) বা পণ্য হাতে পেয়ে মূল্য পরিশোধের সুযোগ আছে এমন প্ল্যাটফর্মগুলোকেই অগ্রাধিকার দিন।

* পণ্যের ফেরত ও পরিবর্তন নীতি (Return & Refund Policy) অবশ্যই জেনে নিন।

​২. আইনি প্রতিকার ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা:

* প্রতারিত হলে দ্রুত জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ জানান। পণ্য কেনার ৩০ দিনের মধ্যে রসিদসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণ জমা দিতে হয়।

* এছাড়া, দেওয়ানী আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা অথবা ফৌজদারি আদালতে প্রতারণার মামলাও করা যেতে পারে।

* কর্তৃপক্ষকে উচিত দ্রুত ডিজিটাল কমার্স অথরিটি অর্ডিন্যান্সের মতো নতুন আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং লাইসেন্সবিহীন ও প্রতারক প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া।

​বর্তমানে ই-কমার্স খাত দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই খাতের টেকসই ও নিরাপদ বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে ক্রেতা-বিক্রেতা-নিয়ন্ত্রক সংস্থা—সকল পক্ষের মধ্যে আস্থা ও স্বচ্ছতার সম্পর্ক গড়ে তোলা অপরিহার্য। প্রতারক চক্রকে কঠোর হাতে দমন করে ক্রেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের দাবি।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator