যশোরে গত ১৩ মাসে দখল ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপির ২২০ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবুও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থামছে না।
দখল, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও হত্যার ইন্ধন—এসব অভিযোগে যশোর জেলা বিএনপিতে শুদ্ধি অভিযান চললেও থামছে না নেতাকর্মীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড। গত ১৩ মাসে অন্তত ২২০ জনকে বহিষ্কার বা পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, তবুও শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। এতে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের সৎ নেতারা।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে আলোচিত নাম আনোয়ার হোসেন ও তুহিন হোসেন। শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনকে জমি দখল ও চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পদ থেকে সরানো হয়েছে। অপরদিকে, মনিরামপুর পৌর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক তুহিন হোসেনের বিরুদ্ধে এক ভ্যানচালককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কিন্তু শুধু আনোয়ার বা তুহিন নন—২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আজ পর্যন্ত যশোর জেলায় সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ২২০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন এক বিবৃতিতে বলেন, "কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় দল নেবে না। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অসদাচরণের বিরুদ্ধে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট।"
তিনি আরও জানান, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে যশোরে যেসব নেতাকর্মী অনিয়মে জড়িত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও অনেক তৃণমূল নেতা-কার্যকর্তা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেন, ছোট পদে থাকা অনেকেই প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। বিএনপির নাম ব্যবহার করে দখল, লুটপাট ও চাঁদাবাজি চলছে। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ায় তাদের শোকজ, পদ স্থগিত বা বহিষ্কার করা হলেও তা দিয়ে কার্যত অপরাধ থামানো যাচ্ছে না। তারা মনে করেন, শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়, অপরাধীদের লাগাম টানতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, “বিএনপি একটি বড় দল। স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূলে নেতাকর্মীর সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান কার্যকর হলেও তৃণমূলের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারলে বিএনপির ভাবমূর্তি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতাও জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৩ মাসে ২২০ জন বহিষ্কার হওয়া বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এতে কি সত্যিই দলের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থামবে, নাকি বহিষ্কারের পরও একই চক্র অন্যভাবে সক্রিয় থেকে যাবে?