বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদ সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেছেন, বিএনপি যদি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে এ শূন্যতার জায়গা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি পূরণ করবে। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের একচেটিয়া বিষয় নয়, বরং জাতির অস্তিত্ব ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এটি অপরিহার্য।
সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে তিনি এ মন্তব্য করেন। সেখানে ফজলুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “বিএনপি যদি আজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ায়, সেটা হবে দেশের জন্য একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। না হলে আরেকটি শক্তি দাঁড়াবে। সেটা আওয়ামী লীগ নাও হতে পারে, শেখ হাসিনারও দরকার নেই দাঁড়ানোর। কিন্তু এক রাজনৈতিক শক্তি অবশ্যই দাঁড়াবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি তো রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ছাত্র। তাই বলছি, ইতিহাস এভাবেই কাজ করে। বিএনপি যদি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়, তাহলে দলটির জন্য তা ইতিবাচক হবে। আমি নিজেও বিএনপির সঙ্গে আছি, এবং চাই আমার দল সঠিক দিকেই অগ্রসর হোক।”
আলোচনার একপর্যায়ে ফজলুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জামায়াতের বিরোধিতার প্রসঙ্গও তোলেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে, “মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগ নিজেদের কুক্ষিগত করতে চেয়েছে। তারা এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে যেন মনে হয় শুধু আওয়ামী লীগই মুক্তিযুদ্ধ করেছে। অথচ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৭১% ভোট পেলেও বাকি ২৯% ভোট বিভিন্ন দলের কাছে গিয়েছিল। এরপরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মওলানা ভাসানীর কাছে গিয়ে সমর্থন চেয়েছিলেন। ভাসানীও তখন বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান জানান।”
জামায়াতের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত মুক্তিকামী মানুষদের ‘ভারতের দালাল’ আখ্যা দিয়েছিল, তাদের দুষ্কৃতিকারী বলেছিল। টিক্কা খান যখন ২৫ মার্চ থেকে ২৮ মার্চের মধ্যে লাখো মানুষ হত্যা করল, তখনই গোলাম আজম টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করে সমর্থন জানিয়েছিল। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এ প্রমাণ রয়েছে।”
বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়ে ফজলুর রহমান বলেন, “আমার দল যদি আমাকে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কারণে সিদ্ধান্ত থেকে সরিয়ে দেয়, তবে আমি সেটা মেনে নেব। তবে আমি চাই না বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সুযোগ হারাক। আমি যদি কোনো ভুল করে থাকি, সেটা আমার জানা উচিত। দল কখনও বলেনি আমি কী ভুল করেছি। আমাকে বলা হয়েছে আমি কুরুচিপূর্ণ বক্তৃতা দিয়েছি। অথচ আমি যদি সত্যিই তা করে থাকি, তাহলে টিভি চ্যানেলগুলো আমাকে বারবার আমন্ত্রণ জানাত না।”
তিনি আরও দাবি করেন, তার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, তিনি চান বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আরও শক্ত অবস্থান গ্রহণ করুক। ফজলুর রহমানের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আওয়ামী লীগের একক সম্পদ হিসেবে তুলে ধরা যাবে না, কারণ এটি পুরো জাতির সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ফল।
তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিএনপির অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হলে সেটি দলের জন্য বড় রাজনৈতিক সংকট ডেকে আনতে পারে। আর যদি দলটি সাহসী পদক্ষেপ নেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয়, তাহলে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নতুনভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে।