কিশোরগঞ্জ, ২০ সেপ্টেম্বর — দীর্ঘ নয় বছর পর শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) জেলা বিএনপির ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সকাল ১১টায় পুরাতন স্টেডিয়ামে সম্মেলন উদ্বোধন করবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। উৎসবমুখর পরিবেশ ও নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের মাঝেই এক চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্তভিত্তিক বিতর্ক দেখা দিয়েছে— সম্মেলনের ব্যানার ও দাওয়াতপত্রে কিশোরগঞ্জের আলোচিত নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমানের নাম নেই।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক প্রদত্ত বক্তব্যে ফজলুর রহমান জানান, দলীয় নির্দেশে তাকে বাতিল করা হয়েছে এবং তিনি এখন ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না — এমনটি শুনে তিনি ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ। তিনি মন্তব্য করেছেন, “আমাকে বলে আমি বাতিল হয়ে গেছি, কিশোরগঞ্জ সম্মেলনে যেতে পারব না। কে সহ্য করতে পারে এগুলা। আমিও তো মানুষ, এ দলের জন্য কী করেছি — জেল খেটেছি, নির্বাসনে থেকেছি, দেশ নেত্রী খালেদা জিয়ার নামে শতাধিক বক্তৃতা দিয়েছি।”
ফজলুর রহমান আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ ছিল— জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থান নিয়ে দেওয়া এক বক্তব্য বিভ্রান্তিকর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ওই কারণে দলের প্রাথমিক সিদ্ধান্তে তাকে তিন মাসের জন্য প্রতিষ্ঠানের সব পর্যায়ের পদ থেকে স্থগিত করা হয়। তিনি জানান, এর আগেও তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন এবং কিশোরগঞ্জ জেলার দায়িত্বও পালন করেছেন। ওই পোস্টে তিনি দলকে অনুরোধ জানিয়েছেন— সম্মেলনের আগে তার স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া হোক যাতে তিনি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে পারেন।
ফজলুর রহমানের কথায়, “আমি তো বিএনপি করি; ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরে খালেদা জিয়া আমাকে আহ্বায়ক করে কিশোরগঞ্জে দল গঠন করেন। আমি আহ্বায়ক ও কিশোরগঞ্জের সভাপতি ছিলাম। আমি হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। গায়ের রক্ত নিয়ে সম্মেলনে হাজির হয়েছি। আমি কিশোরগঞ্জে আট বছর নেতৃত্ব দিয়েছি।” তিনি বলেন, “কিছুদিন পর সম্মেলনে হাজার হাজার নেতাকর্মী আসবে, আর আমি ঢাকায় বসে থাকব—এটা কিভাবে সহ্য করব? আমি সেই দলের জন্য জীবন বিলিয়ে দিয়েছি; কোন সদস্য বা নেতা যদি বলতে পারে না ‘ফজলু সম্মেলনে আসুক’, তাহলে অনেক প্রশ্ন থেকেই যায়।”
কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির আভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, নির্দিষ্ট একটি বিবৃতির প্রেক্ষিতে ধারাবাহিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং স্থগিতাদেশের মেয়াদ তিন মাস — যা সংশ্লিষ্ট বিধি ও ডিসিপ্লিনারি প্রক্রিয়ার আওতায় হয়েছে। তবে ঐতিহ্যবাহী ও পর্যায়ক্রমিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে অনেক স্থানীয় নেতার অনুরোধও রয়েছে— রাজনৈতিক ভাবাবেগ ও পুরাতন নেতৃত্বদের উপস্থিতি সম্মেলনের প্রভাব ও ঐতিহ্য রক্ষায় জরুরি, এজন্য স্থানীয় নেতৃত্বকে মৃদু সমঝোতার পথে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে।
কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। একাংশ বলেন, দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি; অন্যাংশ মনে করেন, সম্মেলনে অভিজ্ঞ ও সুপরিচিত নেতাদের এনে ঐতিহ্য ও একতাকে জোরদার করা উচিত। একজন স্থানীয় নেতা জানান, “সম্মেলন হচ্ছে উৎসব—নেতা, কর্মী, সমর্থকরা একসঙ্গে মিলে দলকে শক্তিশালী করার সুযোগ পায়। ব্যক্তিগত বা সাময়িক বাধা থাকলে সেটার সদ্যাবস্থায় সমাধান করার বিকল্প থাকা উচিত।”
রাজনীতিটিকে অনেক সময় আবেগ ও নীতিগত দাবি একসঙ্গে টানাহিচড়া করে; কিশোরগঞ্জের এই ঘটনা তারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপি নেতা হিসেবে ফজলুর রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচয় ও তার জেল-নির্বাসনের অধ্যায় গুলো কেবল ব্যক্তিগত নয়—সেই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবেশ ও নেতৃত্ব নিয়ে থাকা অভিজ্ঞতার প্রতিফলনও বটে। স্থানীয় নেতারা মনে করেন, সম্মেলনের মঞ্চে যদি এমন পুরনো ও পরিচিত মুখদের উপস্থিতি সীমাবদ্ধ করা হয়, তাহলে তা স্থানীয় ঐতিহ্যগত শক্তি ও সমর্থনশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্মেলনকে ঘিরে প্রতিটি ধাপ মনিটর করছে জেলা সংগঠন; ব্যানার, ডাকা-নামা ও অতিথি-তালিকা চূড়ান্ত করার আগে দলের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ও স্থানীয় পরামর্শাবলী উভয়কেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তারা জানান। ফজলুর রহমানের অনুরোধ তুলে নেওয়ার সম্ভাব্যতা প্রসঙ্গে আরো জানা গিয়েছে, এরকম অনুরোধগুলো প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরে কেন্দ্রে প্রেরিত হতে পারে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেবেন—তবে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে, সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সমর্থকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর শুরু করেছেন; কিছুরা নেতার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সমর্থন জানিয়েছেন, আবার অনেকে দলীয় শৃঙ্খলা ও নিয়ম মেনে চলার পক্ষেই আছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচন ও পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগে এধরনের বিষয়গুলো দলীয় ইমেজ ও জনমত নিয়েও প্রভাব ফেলতে পারে—তাই দ্রুত ও নিয়মসিদ্ধ সমাধান বড় ভূমিকা রাখবে।
ফজলুর রহমান সভায় যেতে না পারলে কেবল তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না—স্থানীয় রাজনৈতিক সমাবেশের ভাবমূর্তি ও কিছু ক্ষেত্রে সমর্থক-উপস্থিতিও প্রভাবিত হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপি কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে কীভাবে বিষয়টির সমাধান করে সম্মেলনকে সুষ্ঠু ও অংশগ্রাহ্য করা যায়। সম্মেলন শেষ হলে অথবা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোনো ঘোষণা দিলে সেটি নিয়ে পরবর্তী রিপোর্টে বিস্তারিত জানানো হবে।