বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, কোনো আন্দোলন বা বিপ্লব তখনই সফল হয়, যখন এর পেছনে একটি শক্তিশালী সংগঠন থাকে। তিনি মন্তব্য করেন, সংগঠন ছাড়া কোনো আদর্শ টিকে থাকতে পারে না এবং বিপ্লব কখনো পূর্ণতা পায় না।
শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম মিলনায়তনে আয়োজিত বিশিষ্ট মার্কসবাদী চিন্তাবিদ ও কমিউনিস্ট নেতা বদরুদ্দিন উমরের শোকসভায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ফখরুল বলেন, “আজকের সমাজে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তার মূল কারণ হলো সংগঠনের দুর্বলতা। একটি শক্তিশালী বিপ্লবী সংগঠন ছাড়া সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায় না। যারা সত্যিকার অর্থে জনগণের অবস্থার উন্নতি করতে চান, তাদের অবশ্যই রাজনৈতিক সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে এবং মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, “বদরুদ্দিন উমর আজীবন তার আদর্শ ধরে রেখেছিলেন। তিনি কখনো আপস করেননি, কখনো সুবিধাবাদী হননি। আমরা যারা রাজনীতি করি, তার তুলনায় নিজেদের খুব ছোট মনে হয়। তিনি ছিলেন সাহসী, নির্ভীক এবং আদর্শবান নেতা।”
বদরুদ্দিন উমর গত ২৭ আগস্ট রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী অঙ্গনে গভীর শোক নেমে আসে।
শোকসভায় বক্তব্য দেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমি তার সম্পাদিত পত্রিকা নিয়মিত পড়তাম। তিনি অসাধারণ মেধাবী ছিলেন এবং শতাধিক গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেছেন। ব্যক্তিগত সম্পদ ভোগ না করে তিনি সমাজের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় তার লেখনীই প্রমাণ করেছিল, রাজনীতির বাইরে কিছুই নেই।”
অধ্যাপক চৌধুরী আরো বলেন, “তাকে এক সময় একটি পত্রিকা থেকে লেখার কারণে বের করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি থেমে যাননি, নতুন পত্রিকা ‘নয়া পদধ্বনি’ প্রকাশ করেছিলেন। সেই পত্রিকায় তিনি সংস্কৃতি ও মুক্তচেতনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। আজ তার মৃত্যুতে রাজনীতি ও সাহিত্য উভয় ক্ষেত্রই অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হলো।”
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “ভালো ছাত্র রাজনীতি করবে— এ ধারণা কেউ বিশ্বাস করত না। কিন্তু বদরুদ্দিন উমর তা প্রমাণ করেছেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ একজন চিন্তাবিদ, যিনি গণঅভ্যুত্থানকে গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন। তার মৃত্যুতে আমরা শুধু একজন মানুষকেই হারাইনি, হারিয়েছি একটি প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।”
শোকসভায় অন্যান্য বক্তারাও বলেন, বদরুদ্দিন উমর শুধু লেখক ছিলেন না, ছিলেন একজন চিন্তাশীল বিশ্লেষক। তিনি প্রতিটি ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতেন লেখার মাধ্যমে, যা নতুন প্রজন্মের জন্য মূল্যবান শিক্ষা হয়ে থাকবে। তার অনুপস্থিতিতে এদেশ একটি দিকনির্দেশককে হারাল।
মির্জা ফখরুল বলেন, “আজ আমরা তার শূন্যতা অনুভব করছি। কিন্তু তার আদর্শ, তার লেখা, তার সংগ্রামী জীবন আমাদের জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে। যদি আমরা সংগঠনকে শক্তিশালী করি এবং মানুষের পাশে দাঁড়াই, তবেই তার স্বপ্নের সমাজ গড়ে তুলতে পারব।”
বক্তাদের মতে, বদরুদ্দিন উমর ছিলেন রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সাহিত্য অঙ্গনের এক অনন্য প্রতিভা। তার মৃত্যুতে জাতি একজন নির্ভীক কণ্ঠস্বর হারাল, যা পূরণ করা সম্ভব নয়।