আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের বিরুদ্ধে মামলায় রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন দাবি করেছেন, তাদের শাসনামলে কোনো দুর্নীতি বা হত্যাকাণ্ড ঘটেনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নতুন মোড় এসেছে। বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে কোনো দুর্নীতি, হত্যাকাণ্ড বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়নি।
এর আগে মামলার ৪৬তম সাক্ষী হিসেবে টানা দুদিন জবানবন্দি দেন সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান। তিনি তার সাক্ষ্যে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলের নানা অনিয়ম, গুম-খুন, দুর্নীতি ও বিশেষ করে জুলাই-আগস্টে সংঘটিত alleged গণহত্যার চিত্র তুলে ধরেন। তার মতে, এই সময়টিই ছিল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের প্রতিচ্ছবি।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে আসামিদের পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী মো. আমির হোসেন এ বক্তব্যকে সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা ভিত্তিহীন এবং কাল্পনিক। তাদের আমলে বাংলাদেশে কোনো দুর্নীতি বা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়নি। এ ধরনের অভিযোগ কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
তিনি আরও যুক্তি দেন, কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি বলেই শেখ হাসিনা কিংবা কামালের নির্দেশ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সেই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক আইনে প্রচলিত কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বা নেতৃত্বের দায় এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ, যে অপরাধই সংঘটিত হয়নি, সেখানে নেতৃত্বের দায় প্রশ্নে আসে না।
আইনজীবী আমির হোসেন আরও দাবি করেন, জুলাই মাসে সংঘটিত অভ্যুত্থানের সময়ও কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। তাই হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি এখানে অবান্তর। এমনকি তার বক্তব্যে উঠে আসে, গত ১৬ বছরে দেশে কোনো ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরশাসনের উত্থান ঘটেনি, বরং দেশ গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালিত হয়েছে।
সাক্ষ্যগ্রহণের দ্বিতীয় দিনে সকাল পৌনে ১১টা থেকে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়। দুপুর দেড়টা পর্যন্ত চলে মাহমুদুর রহমানকে জেরা। দীর্ঘ এই জেরায় আইনজীবী আমির হোসেন নানা প্রশ্ন তুলে তার সাক্ষ্যের অসঙ্গতি প্রমাণের চেষ্টা করেন। দুপুরের বিরতির পর আবারও শুনানি শুরু হলে ট্রাইব্যুনালে হাজির হন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি এই মামলার ৪৭তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
এসময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী আমির হোসেন পুনরায় বলেন, “আমার মক্কেলরা কোনো ধরনের হত্যাকাণ্ড বা মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিলেন না। বরং তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৈরি করা হয়েছে।”
এই মামলার অগ্রগতি ঘিরে দেশে নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ একদিকে সাক্ষীরা আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গুম-খুন ও দুঃশাসনের অভিযোগ তুলছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা সেটিকে অস্বীকার করছেন। ফলে মামলার রায় কী হতে পারে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেড়েছে কয়েকগুণ।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার জটিলতা আরও বাড়বে। কারণ, এখানে রাজনৈতিক ইতিহাস, মানবাধিকার ইস্যু ও আন্তর্জাতিক আইনের নানা জটিল ধারা একসাথে যুক্ত হয়েছে। তারা মনে করছেন, সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর নির্ভর করেই শেষ পর্যন্ত এই মামলার দিকনির্দেশনা ঠিক হবে।
দিনশেষে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের পক্ষের আইনজীবীরা যেকোনো মূল্যে তাদের মক্কেলকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইছেন। অপরদিকে, সাক্ষীরা চেষ্টা করছেন আওয়ামী শাসনামলের বিভিন্ন অন্ধকার দিক ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরতে। এই দ্বন্দ্বমূলক পরিস্থিতি আরও অনেকদিন ধরে চলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।