বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণহত্যার নির্দেশের অডিও ফাঁসের পর প্রেস সচিব জানিয়েছেন—তাঁর আর পালানোর কোনো পথ নেই। আন্তর্জাতিক মহলে বিচার দাবির চাপও বাড়ছে।
শেখ হাসিনার পালানোর আর কোনো পথ নেই—এমনই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। গণআন্দোলন ও সেই প্রেক্ষাপটে সংঘটিত দমননীতি এবং সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের মানুষের ওপর যেভাবে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে, তার হিসাব এবার কড়ায় গণ্ডায় দিতে হবে।
বুধবার, ৯ জুলাই, শফিকুল আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্টে এই মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি'র একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন উল্লেখ করেন। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন, যার প্রমাণস্বরূপ একটি ফোনালাপের অডিও ফাঁস হয়েছে।
ফেসবুক পোস্টে প্রেস সচিব লেখেন, “বিবিসির ইনভেস্টিগেশন ইউনিট ‘BBC Eye’ এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জুলাইয়ের গণআন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে নিরাপত্তা বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়। সেখানে শতাধিক শিশুসহ অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর তথ্য এসেছে। এমন স্পষ্ট প্রমাণ সামনে আসার পর শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করার আন্তর্জাতিক চাপ আরও জোরদার হবে।”
তিনি আরও বলেন, “শেখ হাসিনা যে গণহত্যার দায়ে অপরাধী, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাঁর কণ্ঠে রেকর্ডকৃত সেই নির্দেশনামূলক অডিও এখন সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তিনি বলেছেন—‘যেখানেই আন্দোলনকারী পাওয়া যাবে, গুলি করা হবে।’ এটা কোনো রাজনীতিক ভাষণ নয়, এটা সরাসরি হত্যার অনুমতি।”
বিবিসির ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৮ জুলাই শেখ হাসিনা গণভবন থেকে একটি ফোন করেন, যেখানে তাকে স্পষ্টভাবে বলা শোনা যায়—“ওদের যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানেই গুলি করো।” প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি কোনো সাধারণ মতামত ছিল না, বরং একটি সামরিক সিদ্ধান্তের মতো প্রাণঘাতী নির্দেশ।
এই ফোনালাপটি চলতি বছরের মার্চে ফাঁস হয় এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করে যে, ফাঁস হওয়া অডিওর কণ্ঠস্বর শেখ হাসিনার কণ্ঠস্বরের সঙ্গে মিলে গেছে।
শফিকুল আলম লিখেছেন, “এখন সময় এসেছে, জাতির সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই বর্বরতার জন্য শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর। তিনি এবং তাঁর নির্দেশে যারা মানুষ হত্যা করেছে, কেউই শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারবে না।”
এই অডিও প্রকাশ এবং বিবিসির বিস্তারিত অনুসন্ধানের পর দেশ-বিদেশে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিষয়ক সংগঠনগুলো এখন বাংলাদেশে একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি তুলছে।
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে সব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মহলে উঠেছে, এই অডিও ফাঁস তার এক রক্তাক্ত দলিল হিসেবে সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই অডিও যদি সত্যি হয়—তবে তা শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দেশের ভেতরে গণআন্দোলনের তীব্রতা যেমন বাড়ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক চাপও দিনে দিনে জোরদার হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, শেখ হাসিনার সামনে এখন দুটি পথ—বিচার কিংবা পালানো। আর শফিকুল আলম স্পষ্ট করে দিয়েছেন, “এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার পালানোর আর কোনো পথ নেই।