সত্যজিৎ দাস:
বাংলা লালনসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ফরিদা পারভীন বর্তমানে ঢাকার মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কয়েক দিন ধরে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজবের কারণে শিল্পীর পরিবার পরিজন সকলে বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পড়েছেন।
তবে তাঁর এই সংকটময় অবস্থার মাঝেই গতকাল রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ভিত্তিহীন গুজব,ফরিদা পারভীন নাকি আর নেই। কেউ কেউ তাঁর ছবি পোস্ট করে মৃত্যুর ভুয়া খবর প্রচার করতে থাকেন। বিষয়টি নিয়ে চরম বিব্রত ও ক্ষুব্ধ তাঁর পরিবার।
শিল্পীর স্বামী,যন্ত্রসংগীতশিল্পী গাজী আবদুল হাকিম আজ দুপুরে সমকালকে বলেন,“এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে। ফরিদা এখনো জীবিত,আমরা তাঁকে ঘিরে চরম দুশ্চিন্তায় আছি। এমন সংকটময় মুহূর্তে মানুষ দোয়া করবে,এই তো প্রত্যাশা। অথচ কেউ কেউ যাচাই না করেই তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এটা কী ধরনের মানসিকতা!”
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী জানান,‘ফরিদা পারভীন হাসপাতালে ভর্তি হন তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে। পরবর্তীতে তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। রক্তে সংক্রমণ রয়েছে। জ্ঞানের মাত্রাও অনেকটা কমে গেছে। কিডনি পুরোপুরি বিকল হয়ে গেছে,সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস দিতে হচ্ছে। তাঁর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন,যেকোনো সময় ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হতে পারে।’
ফরিদা পারভীনের জন্য এখন প্রয়োজন ভালোবাসা,সহানুভূতি ও প্রার্থনা। অথচ এমন এক মানবিক মুহূর্তে যাচাই-বাছাই না করে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া শুধু অমানবিক নয়,বরং সমাজের ওপর এক ভয়াবহ চাপও তৈরি করছে।
আমাদের সমাজে গুজব এখন এক অদৃশ্য ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। কিছু মানুষ ক্লিক, শেয়ার বা মন্তব্য পাওয়ার লোভে যাচাই না করেই ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে ব্যক্তিগত জীবনের মানসিক আঘাত তো আছেই, পাশাপাশি সমাজে আতঙ্ক,বিভ্রান্তি ও অনাস্থাও তৈরি হচ্ছে।
বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো গুজব রটনাকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে ঘৃণিত বলে বিবেচনা করে।
ইসলামে যাচাই ছাড়া কোনো খবর প্রচার করতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-“হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে যাচাই করো।”—(সুরা হুজরাত,আয়াত ৬)
রাসুল (সা.) বলেছেন-“সব শোনা কথার প্রচার একজন ব্যক্তিকে মিথ্যাবাদী বানাতে যথেষ্ট।”-(সুনানে আবু দাউদ,হাদিস ৪৯৯২)
হিন্দু শাস্ত্রেও গুজব ও অপবাদকে মহাপাপ বলা হয়েছে।
মনু সংহিতায়;বলা হয়েছে:
“নাভিযুক্তং ব্ৰুয়ীত কিঞ্চিদভ্যাখ্যানমন্বপদিশেত্, অনৃতং চ ন বদেত্।”
অর্থ: যা নিজে জানো না,তা বলো না। মিথ্যা বলাও নিষিদ্ধ।
ভগবদগীতায় বলা হয়েছে-
“অনুদ্বেগকরং বাক্যং,সত্যং প্রিয়হিতং চ যৎ"
অর্থ: সত্য এবং প্রীতিকর,কিন্তু কারো মনে কষ্ট না দেয়,এমন বাক্যই বলার উপযোগী।
এছাড়া উপনিষদ শিক্ষা দেয়;“সত্য বলো,প্রিয় ভাষায় বলো,কিন্তু এমন সত্য বলো না যা কষ্ট দেয়। প্রীতিকর হলেও মিথ্যা নয়।”
এই ধরনের ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে বারবার উঠে আসে একটি প্রশ্ন: আমরা কি প্রযুক্তির ব্যবহারে দায়িত্ববান? সত্য-মিথ্যার যাচাই ছাড়া শেয়ার করার প্রবণতা আমাদের সামাজিক কাঠামোকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
এই সময় আমাদের উচিত:
সংবেদনশীলতা বজায় রাখা,সত্যতা যাচাই করা এবং গুজবের বদলে সহানুভূতির পাশে দাঁড়ানো।
মনে রাখতে হবে,গুজব ছড়ানো শুধু আইনের চোখে অপরাধ নয়,মানবিকতার কাছেও কলঙ্ক।